কক্সবার্তা ডেস্ক :
এবং যে শহরকে আমি ধবংস করে দিয়েছি, তার অধিবাসীদের সেখানে ফিরে না আসা অবধারিত; যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধনমুক্ত করে দেয়া হবে, এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভূমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে (অথবা সব দিকে ছড়িয়ে পড়বে)।” [কুরআন, সূরা আনবিয়া ২১:৯৫-৯৬]
(এই ঘটনার পর ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে এবং ইয়াজুজ-মাজুজের বিশ্ব ববস্থা অনুযায়ী পৃথিবীর উপর কর্র্তৃত্ব করবে)।
কম করে বললেও ব্যাপারটি আজব, রহস্যময় এবং একটি ধাঁধাঁর মত মনে হয় যে, পবিত্র কুরআনে ‘জেরুজালেম’ (আরবিতে কুদ্স বা বায়তুল মুকাদ্দাস) শহরটির নাম একটি বারও উল্লেখ করা হয়নি! অথচ, কুরআনে উল্লেখিত কত নবীর সাথে ঐ ‘পবিত্র শহরের’ সম্পর্ক রয়েছে; আর এই শহরেই, মক্কা ও মদীনায় আল্লাহর নবী (সা.) কর্তৃক নির্মিত আল্লাহর গৃহসমূহ ছাড়া, আরেক নবীর হাতে নির্মিত আল্লাহর অপর গৃহখানি রয়েছে।
আসলে আল্লাহর ঐ গৃহখানি (মসজিদ আল্-আকসা) কুরআনে কেবল উল্লেখিত হয়েছে তাই নয়, তারই সাথে উল্লেখ করা হয়েছে রাসূলল্লাহ্ (সা.)-এর রাত্রিকালীন সেই অলৌকিক যাত্রার কথা, যে যাত্রায় তাঁকে মক্কা থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত আল্লাহর ঐ গৃহখানিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ বিষয়টি সম্পর্কে এমন রহস্য অবলম্বন করার পেছনে কারণ হয়ত বা ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নিহিত, যাতে মনে হয় যে, শেষ যুগে জেরুজালেম একটা কেন্দ্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য নির্ধারিত। সে কারণে আল্লাহ্ হয়ত ঐ শহরের নাম এবং পরিণতিকে একটা পবিত্র মেঘের আড়ালে আচ্ছন্ন রেখেছেন, যে মেঘের আবরণ উপযুক্ত সময় না আসা পর্যন্ত সরানো হবে না। অর্থাৎ, ইতিহাসের সমাপ্তিতে নিজ ভূমিকা পালন করার জন্য জেরুজালেমের প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সেই আড়াল সরানো হবে না।
জেরুজালেমের শেষ অধ্যায় সম্পর্কে ইসলামি সাহিত্যে প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি সম্বন্ধে ড. ইসমাঈল রাজী আল্-ফারূকি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন— “দুর্ভাগ্যবশত বিষয়টির উপর কোন ইসলামি সাহিত্য নেই।” আসল ব্যাপারটি এই যে, মেঘের আবরণ প্রত্যাহার করার সময় না আসা পর্যন্ত, কেউ এই বিষয়ের উপর লিখতে পারত না। এই গ্রন্থখানি এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে যে, ঐ [রহস্যের] মেঘের আবরণ এখন সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ইহুদীরা যখন ঈসা (আ.)-কে প্রত্যাখ্যান করল এবং পরবর্তীতে এই বলে গর্ব করল যে, তারা তাঁকে হত্যা করেছে (দেখুন কুরআন, সূরা নিসা ৪:১৫৭), তখনো তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল যে, প্রতিশ্রুত মসীহর আগমনী হচ্ছে ভবিষ্যতের একটি ঘটনা (যার সাথে সাথে ইহুদী ধর্মের সোনালী যুগের প্রত্যাবর্তন ঘটবে)। তারা বিশ্বাস করত যে, অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে, স্বণর্যুগের প্রত্যাবর্তনের জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হতে হবে:
০ Gentiles বা অ-ইহুদীদের নিয়ন্ত্রণ থেকে ‘পবিত্রভূমি’ মুক্ত হতে হবে।
০ নির্বাসিত ইহুদীরা তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পবিত্রভূমিতে ফিরে আসবে।
০ ইসরাঈল রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
০ ইবরাহীম (আ.)-এর বিধাতার (ইহুদী নিয়মে) উপাসনার জন্য, বিশেষ উপাসনালয়টি পুনরুদ্ধার করা হবে।
০ হযরত দাউদ ও সুলায়মান (আ.)-এর যুগের মত, আবারো, ইসরাঈল সমগ্র পৃথিবীর জন্য ‘নিয়ন্তা রাষ্ট্রে’ পরিণত হবে।
ইসরাঈলের শাসক হিসেবে, দাউদ (আ.)-এর সিংহাসন থেকে, অর্থাৎ জেরুজালেম থেকে, একজন ইহুদী রাজা সমগ্র পৃথিবীর উপর শাসন করবেন; আর সেই রাজাই হবেন প্রতিশ্রুত মসীহ।
আর সেই শাসন হবে চিরস্থায়ী। নবী মুহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেছেন যে কিয়ামতের একটি প্রধান আলামত হবে এই যে, আল্লাহ্ ইহুদীদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য এমন একজনকে তৈরি করবেন এবং ইহুদীদের কাছে পাঠাবেন, যে নিজেকে ‘মসীহ’ হিসেবে প্রতীয়মান করবে এবং তাদেরকে বিশ্বাস করাবে যে কথিত ‘স্বর্ণযুগ’ ফিরে আসছে। কিন্তু আসলে ঐ ‘ভণ্ডমসীহ’ ধোঁকা দিয়ে তাদেরকে আল্লাহর কঠিনতম শাস্তির পথে পরিচালিত করবে। সেই ‘ভণ্ডমসীহ’ বা দাজ্জালকে, (খৃস্টানদের কাছে যার পরিচয় হচ্ছে Anti-Christ বা ‘খৃস্টশত্রু’), সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ই সৃষ্টি করেছেন, এবং এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ‘শেষ যুগে’ তাকে পৃথিবীতে ছেড়ে দেয়া হবে। এখন নীচের বিষয়গুলো ভেবে দেখুন—
০ ব্রিটিশ সেনাপতি অ্যালেনবি (Gen. Allenby) ১৯১৭ সালে যখন তুর্কী মুসলিমদের কাছ থেকে জেরুজালেম দখল করে নেন, তখনই (ইহুদী বিশ্বাস মতে) মুসলিম— ‘gentile’ বা অ-ইহুদীদের কাছ থেকে ‘পবিত্রভূমি’ মুক্ত হয়।
০ আল্লাহ্ নির্ধারিত ২০০০ বছরের নির্বাসনের পর [আদি] ইসরাঈলী ইহুদীগণ, ‘পবিত্রভূমির’ উপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সেখানে ‘প্রত্যাবর্তন’ করেছে। ১৪০০ বছর আগে কুর’আন যেমন বলেছিল যে ‘সময়ের শেষ অধ্যায়ে’ এমনটি হবে, ব্যাপারটা ঠিক তেমনি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য স্থানে বসবাসরত ককেশীয় ইহুদীদেরও সেখানে পৌঁছানটা নিয়তিরই লেখা।
০ ১৯৪৮ সালে ইসরাঈল ‘পুনরুদ্ধার’ করা হয়েছিল আর সেটাকে প্রাচীন ইসরাঈল রাষ্ট্র বলে তারা দাবী করে।
০ এই ইসরাঈল পারমাণবিক ও তাপ-পারমাণবিক মারণাস্ত্র দ্বারা যুদ্ধসাজে সজ্জিত। মনে হচ্ছে ফিলিস্তিনী ‘ইনতিফাদা’ (যা অ্যারিয়েল শ্যারন কর্তৃক উস্কানির মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট) এবং ১১ই সেপ্টেম্বরে মোসাদ কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ— এই দুই ঘটনার অজুহাতে ইসরাঈল এমন এক যুদ্ধে যাওয়ার নিয়তি বরণ করতে যাচ্ছে, যে যুদ্ধের এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাতিসংঘ এবং বাকী গোটা বিশ্বকে অবজ্ঞা করে, ইসরাঈল নিজ প্রতিবেশের গোটা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে।
ঐ যুদ্ধে, তৌরাতে প্রতিশ্রুত এলাকা অনুযায়ী ইসরাঈলী ভূখণ্ডের সম্প্রসারণ ঘটবে বলেই মনে হয়, অর্থাৎ মিশরের নদী থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা পৃথিবীকে অবজ্ঞা করার কার্যে সাফল্য এবং মার্কিন ডলার তথা মার্কিন অর্থনীতির ধস সম্পর্কিত ভবিষ্যতবাণীর বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে, ইউরো-ইসরাঈল অবশেষে, ব্রিটিশদের উপর তার প্রাথমিক নির্ভরশীলতা এবং তৎপরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপর তার নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসবে। অবশেষে ইউরো-ইহুদী রাষ্ট্রটি পৃথিবীর সামরিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের স্থলাভিষিক্ত হবে, আর সেই সুবাদে, গোটা পৃথিবীর নেতৃত্বের দাবীসহ এমনভাবে পৃথিবীর উপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, যা ব্রিটেন বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কখনো করা সম্ভব হয়নি।
০ এরপরেই, ভবিষ্যত বাণী মোতাবেক, আল্-আকসা মসজিদের ধ্বংস-সাধন ও সেই স্থলে ইহুদী উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার কাজটি সমাধা হবে। ‘মসীহ বিধাতার জন্য একখানা গৃহ নির্মাণ করবেন’ (বাইবেলের পুরাতন নিয়ম, ১ খান্দাননামা ১৭:১১১৫)— নবী নাথনের এই ভবিষ্যদ্বাণী, বর্তমান মসজিদের ধ্বংস সাধনের ইঙ্গিত বহন করে। [উপরে আলোচিত] প্রতিটি বিষয় থেকে ইহুদীদের কাছে অবশ্যই মনে হবে যে, হযরত সুলায়মান (আ.)-এর জেরুজালেম থেকে পৃথিবী শাসন করার স্বর্ণযুগ ফিরে আসার ভবিষ্যদ্বাণী বুঝিবা বাস্তবতা লাভ করতে চলেছে। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, ভণ্ডমসীহ্ ‘দাজ্জালের’ হস্তক্ষেপ ছাড়া উপরের কোন ঘটনাই বাস্তবায়িত হবার উপায় নেই।
সুতরাং উপরে বর্ণিত সকল ঘটনাবলীই আসলে এক ধরনের ধোঁকা। উপরোক্ত ঘটনাবলী ঘটে যাওয়ার পরও বলতে হবে হযরত সুলায়মান (আ.)-এর গড়ে তোলা পবিত্র ইসরাঈল রাষ্ট্র তখনো সত্যিকার অর্থে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং আসল ইসরাঈলের জায়গায় এক ভণ্ড ইসরাঈল আজ অবস্থান গ্রহণ করেছে। এই লেখকের কাছে এটা স্পষ্ট যে, ঐ [রহস্যের] মেঘের আবরণ সরে গেছে এবং ‘শেষ সময়’ সমাসন্ন; আর, ইহুদীদের জন্য [অবধারিত ধ্বংস থেকে] ফিরে আসার উপায় নেই। সেজন্যই সম্ভবত, এখনকার এই সময়ে এই গ্রন্থটি লেখা সম্ভব হয়েছে।
উপরে উল্লেখিত সবকিছুরই ব্যাখ্যা কুরআনে রয়েছে। তবে সেই ব্যাখ্যা অনায়াসে সনাক্ত করা যায় না। এর অনেক কিছুই আমাদের গ্রন্থ, The Religion of Abraham and the State of Israel— A View from the Qur’an-এ ব্যক্ত করা হয়েছে। নাম ব্যবহার না করে কুরআন বার বার জেরুজালেমকে একটি ‘নগরী’ বা ‘শহর’ বলে অভিহিত করেছে। ‘শেষ যুগে’ জেরুজালেমের ভূমিকার উপর, আল্লাহর তরফ থেকে যে রহস্যের মেঘের আবরণ ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল, এটা যেন তারই অংশ। উদাহরণ স্বরূপ, কুরআনে ঐ ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে যখন তাদের নবী মূসা (আ.)-কে আল্লাহ তলব করেছিলেন এবং তিনি সিনাইয়ের চূড়ায় গিয়েছিলেন, আর ইত্যবসরে ইহুদীরা সোনার তৈরি বাছুরের পূজা করতে শুরু করে। পবিত্র কুরআনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কিছুর
ঐ ধরনের উপাসনা হলো ‘শির্ক’ যার পরিণতি হচ্ছে আল্লাহর শাস্তি।
“অবশ্য যারা ঐ (সোনার) বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে (অতএব শির্ক করেছে) তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে পার্থিব এ জীবনেই গযব ও লাঞ্ছনা এসে পড়বে।”dome-next-to-city
“যারা (আল্লাহর বিরুদ্ধে) মিথ্যা আবিষ্কার করে, এভাবেই আমরা তাদের শাস্তি দিয়ে থাকি। আর যারা মন্দ কাজ করে, তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয় (তারা দেখবে যে) তোমার প্রতিপালক তওবার পর অবশ্য ক্ষমাকারী, করুণাময়।” (কুরআন, সূরা আ‘রাফ ৭:১৫২-১৫৩)
এরপর কুরআন ঘটনার বর্ণনাকে অব্যাহত রাখে— ‘পবিত্রভূমি’-তে প্রবেশের অনুমতি লাভের আগে, ইসরাঈলিরা তখনও সিনাই মরুভূমিতে অবস্থান করছে— সেই সময় সম্পর্কে কুরআন ঘোষণা করে:
“আর আমি তাদেরকে ১২টি গোত্রে বিভক্ত করে দিয়েছি।”
“এবং নির্দেশ দিয়েছি মূসাকে, যখন তার কাছে তার সম্প্রদায় পানি চাইল যে, স্বীয় যষ্টির দ্বারা আঘাত কর এ পাথরের উপর।”
“অতঃপর এর ভেতর থেকে ফুটে বের হল বারটি প্রস্রবণ।”
“প্রতিটি গোত্র চিনে নিল নিজ নিজ ঘাঁটি। আর আমি তাদের উপর মেঘের ছায়া দান করলাম, এবং তাদের জন্য অবতীর্ণ করলাম মান্না ও সাল্ওয়া।”
“(এবং বললাম): আমি তোমাদের জন্য যে উত্তম আহার্য দান করেছি, সেখান থেকে আহার কর (কিন্তু তারা বিদ্রোহ করল)। তারা আমার কোন ক্ষতি করেনি, বরং নিজেদের আত্মারই ক্ষতি করল।” (কুরআন, সূরা আ‘রাফ ৭:১৬০)
এর পরেই কুরআন জেরুজালেমকে, রহস্যজনকভাবে শুধুমাত্র একটি ‘শহর’ বলে অভিহিত করে:
“আর যখন তাদের প্রতি নির্দেশ হল যে, তোমরা এ নগরীতে (অর্থাৎ জেরুজালেমে) বসবাস কর এবং তোমাদের যেমন ইচ্ছা আহার কর, কিন্তু বিনয় সহকারে কথাবার্তা বল।”
“এবং প্রণত অবস্থায় দরজা দিয়ে প্রবেশ কর; আমি তোমাদের দোষ ত্রুটি ক্ষমা করে দেব; অবশ্য আমি সৎকর্মীদেরকে অতিরিক্ত দান করব।” (কুরআন, সূরা আ‘রাফ ৭:১৬১)
কুরআনের নিম্নলিখিত অধ্যায়ে সতর্কবাণী সহকারে, আরো রহস্যজনকভাবে জেরুজালেমকে কেবল একটি ‘শহর’ বলে আবারও উল্লেখ করা হয়েছে:
“এবং যে শহরকে আমি ধবংস করে দিয়েছি, তার অধিবাসীদের ফিরে না আসা অবধারিত; যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধনমুক্ত করে দেয়া হবে, এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভূমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে (অথবা সব দিকে ছড়িয়ে পড়বে)।” (কুরআন, সূরা আনবিয়া, ২১:৯৫-৯৬)
যখন তারা সকল উঁচু জায়গা থেকে [সমতল ভূমিতে] নেমে আসে, অথবা, সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে, কার্যত তারা তখন পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং ‘ইয়াজুজ মাজুজের’ বিশ্ব ব্যবস্থা (World Order) মোতাবেক পৃথিবীর উপর শাসন করে।
উপরে উল্লেখিত ‘শহরটির’ পরিচিতি নির্ধারণ করতে গিয়ে আমরা, কুরআন এবং হাদিসে ‘ইয়াজুজ-মাজুজ’ সংক্রান্ত যত প্রসঙ্গ রয়েছে, তার সবকটি পরীক্ষা করে দেখেছি। আমরা কেবল একটি মাত্র শহরকেই ‘ইয়াজুজ-মাজুজের’ সাথে সম্পৃক্ত বলে সনাক্ত করেছি— সেটা হচ্ছে জেরুজালেম (দশম অধ্যায় দেখুন)। সুতরাং আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, কুরআনের উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত ‘শহরটি’ হচ্ছে জেরুজালেম!
যখন আমরা জেরুজালেমকে ঐ ‘শহরটি’ বলে সনাক্ত করতে পারি, তখন এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআনে জেরুজালেমের উপর যে রহস্যের মেঘ দেখা যায়, তা তখনই সরিয়ে নেয়া হবে যখন ‘ইয়াজুজ-মাজুজ’-কে মুক্তি দেয়া হবে এবং তার পরিণতিতে তারা প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে নেমে আসবে অথবা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে (অর্থাৎ ‘ইয়াজুজ-মাজুজের’ বিশ্ব-ব্যবস্থায়, পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে)।
বর্তমান সময়ে পবিত্রভূমিতে ইসরাঈলী ইহুদীদের প্রত্যাবর্তন এটা নিশ্চিত করেছে যে ‘ইয়াজুজমাজুজ’-কে ইতোমধ্যেই মুক্তি দেয়া হয়েছে, এবং তারা ইতোমধ্যেই ‘প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে নেমে এসেছে, অথবা, সবদিকে ছড়িয়ে পড়েছে,’ এবং সেহেতু এটা বলা ভুল হবে না, যে তারা ইতোমধ্যেই পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেছে। যে বিশ্বব্যবস্থায় পৃথিবী আজ শাসিত হচ্ছে, তা হচ্ছে ‘ইয়াজুজ-মাজুজের’ বিশ্ব বিন্যাস বা বিশ্ব-ব্যবস্থা।
আর অবশ্যই, ‘ইয়াজুজ-মাজুজ’ই ‘পবিত্রভূমিতে’ ইহুদীদের প্রত্যাবর্তনকে সম্ভব করে দিয়েছে। এখন আমাদের জন্য এই ব্যাপক পরিকল্পনা অনুধাবন করা সম্ভব, যার আওতায় ‘ভণ্ডমসীহ’ দাজ্জাল ইহুদীদেরকে এই ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে থাকবে যে, সে তাদের সোনালী যুগ ফিরিয়ে দিচ্ছে। ঐ মহাপরিকল্পনার সূচনা মনে হয় তখনই হয়েছিল, যখন ‘দাজ্জাল’ (সহীহ্ মুসলিমে তামীম দারী-র হাদীস দেখুন) ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে তার যাত্রা শুরু করেছিল, ইউরোপীয় সভ্যতাকে একটা খৃস্টধর্ম-উত্তর সভ্যতা ও নিশ্চিতভাবে ধর্ম-বিমুখ সভ্যতায় রূপান্তরিত করার জন্য, এবং সেই সভ্যতাকে তাদের খুশীমত ক্ষমতাশালী করে তোলার জন্য। [যুল-কারনাইনও এমনই এক যাত্রায় বেরিয়েছিলেন, তবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য, অন্যায়কে নয়।]
তারপর ঐ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা গেল ‘যায়োনিস্ট’ আন্দোলনের সূচনা হল। ‘যায়োনিজম’ পরবর্তী পর্যায়ে ইসরাঈল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত করল। ‘পবিত্রভূমি’ যেখানে অবস্থিত, সেখানকার সমগ্র অঞ্চলটাই শেষ পর্যন্ত ইহুদী নিয়ন্ত্রণাধীনে যাবে, এটাও মনে হচ্ছে ঐ মহা-পরিকল্পনার অংশ। সেটাই হবে ইহুদীদের দ্বারা পৃথিবী শাসিত হবার দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। এবং সেটাই হচ্ছে ইহুদীদের নজরে ‘দাজ্জালকে’ আসল ‘আসল মসীহ্’ মনে করার একটা পূর্বশর্ত। আর এই মহা-পরিকল্পনার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে সম্পদ ও পানিসম্পদ দ্বারা এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারটি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ‘দাজ্জাল’-এর সাথে সুদের সম্পর্ক এবং ‘ইয়াজুজ-মাজুর’-এর সাথে পানির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে গেছেন। ইসরাঈলী ইহুদীরা ‘পবিত্রভূমিতি’ ফিরে এসেছে। আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা ছাড়া (যাতে ব্রিটেন সবচেয়ে প্রকাশ্য ভূমিকা রেখেছে) ঐ প্রত্যাবর্তন সম্ভব ছিল না। আর তাই আজ এটা স্পষ্ট যে, যেমনভাবে ভণ্ডমসীহ্ ‘দাজ্জাল’ ব্রিটেন থেকে তার অভিযাত্রা শুরু করেছে, তেমনি ‘ইয়াজুজ-মাজুজ’-ও ইউরোপীয় সভ্যতার ভিতরেই অবস্থিত। [চলবে]
তরজমা: মো. এনামুল হক।
vc
- Blogger Comments
- Facebook Comments
Item Reviewed: জেরুজালেম: কুরআনের ‘সেই শহর’
Rating: 5
Reviewed By: Unknown