বার্তা পরিবেশক:
কক্সবাজার শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে অনিয়মটিই এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা দুর্নীতি ভারে ন্যুয়ে পড়েছে শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের কার্যক্রম। কক্সবাজার শহরের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের আশা-আকাংখা পূরণের স্তম্ভ হলেও বর্তমানে এটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মূলতঃ সংস্থাটির সাথে জড়িত কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি স্বচক্ষে দেখেও চোখ সরিয়ে রেখেছেন বলে ক্ষোভ রয়েছে অনেকের। শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে লিখিত কিংবা মৌখিক অভিযোগ করেও কোন কাজ হচ্ছে না। এমনকি এই সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়েও মামলা গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। প্রশ্ন উঠেছে, শহর সমাজসেবা কার্যালয়কে দুর্নীতিগ্রস্থ ও নিয়মকে অনিয়মে পরিণত করার দুঃসাহস দুর্নীতির সাথে জড়িত কর্তারা পায় কোথা থেকে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, শহর সমাজসেবা কার্যালয় থেকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করে সমাজ সেবা অধিদপ্তর। বিধবা ভাতা, প্রতিবন্দ্বী ভাতা, বয়স্ক ভাতা তার মধ্যে অন্যতম। রয়েছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের বিভিন্ন প্রকল্প কার্যক্রম। অতি দরিদ্র সাধারণ মানুষ এই সেবা গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু সরকারের এই মহতী উদ্যোগকে ম্লান করে তুলেছে মুফিজুল ইসলাম নামে শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের এক অফিস সহকারী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অনেকে জানিয়েছেন, মুফিজ নামের ওই অফিস সহকারীর কাছে মূলতঃ পুরো শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্তাব্যক্তিরা জিম্মি। সরকার থেকে প্রদত্ত বিভিন্ন ভাতার বিষয়ে অফিসে সার্বক্ষনিক বিভিন্ন বয়সের লোকজনের আনাগোনা থাকে ওই অফিসে। অফিসে আগত প্রতিবন্দ্বী সন্তানের অভিভাবকদের প্রতিবন্দ্বী সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার নাম করে এবং বয়স্ক ভাতা তালিকায় নাম এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দরিদ্র লোকজনের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকেন ওই মুফিজুল ইসলাম।
ভুক্তভোগীদের অনেকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ভাতাভোগীদের বই নষ্ট বা হারিয়ে গেলে তা পুনরায় পাওয়ার জন্য থানায় জিডি করে আবেদন করতে হয়। সাধারণত হতদরিদ্র লোকজন থানায় গিয়ে জিডি করার ঝক্কি-ঝামেলায় যেতে চায় না বলে বা জিডি করার বিষয়ে তারা অক্ষম হলে সুযোগটি নেন তিনি। এরজন্য সংশ্লিষ্ট ভাতাভোগীদের কাছ থেকে মুফিজুল ইসলাম মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। নিজে আবেদন লিখে এবং থানায় গিয়ে জিডি করে এনে দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে ভুক্তভোগী কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে অসহায়দের টাকা। ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর নামে ইস্যুকৃত জিডির কপি চাইলেও দেন না নিজের দুর্নীতি ঢাকার জন্য। এমনকি আবেদনকারীর নামে তিনি যেসব জিডি ইস্যু করেন তা সংশ্লিষ্ট থানাও পাওয়া যায় না। গত ২১/০১/১৬ ইং, ১৫/৫/২০১৬ ইং, ০৫/০৬/২০১৬, ৬/০৭/২০১৫ সংশ্লিষ্ট বয়স্ক ভাতাভোগীর নামে ইস্যুকৃত বই হারিয়েছে মর্মে থানায় জিডি দেখালেও ওই তারিখে কোন জিডি নেই। মূলতঃ তিনি থানার ডিউটি অফিসারের সীল নকল করে জিডির নাম্বার বসিয়ে দাপ্তরিক কাজ শেষ করে নেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ ৩৩ বৎসর যাবৎ চাকুরি করিয়া আসছিলেন কুমকুম আচার্য নামক এক মহিলা। কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ওই মুফিজুল ইসলাম নিজের দূর্নীতি ঢাকতে সংশ্লিষ্ট কারণের অজুহাত দেখিয়ে ওই মহিলাকে বিভিন্ন হেনস্তা করে। এক পর্যায়ে ওই মহিলা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে স্ট্রোকে মৃত্যু হয়। এনিয়ে ওই মুফিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অভিযোগ এনে কক্সবাজার সিনিয়র স্পেশাল জজ্্ আদালতে ২৬/২০১৭ নং মামলা দায়ের হয়। যা ওই আদালত মুফিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে পেনাল কোড ৩০৪/৩৪ ধারা তৎসহ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধের অভিযোগে পিটিশন হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মচারী দুটো প্রতিষ্ঠানে একসাথে চাকুরী করা নিয়মবর্হিভূত হলেও মুফিজুল ইসলাম এক সাথে দুটো প্রতিষ্ঠানে চাকরী করে নিয়মিতভাবে বেতন ভাতা নিচ্ছেন।
খবরে প্রকাশ, শহর সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প পরিষদেও বিভিন্ন খাতে তার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। শহর সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত কম্পিউটার প্রশিক্ষণে প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ভর্তির সময় নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে ভর্তির সুযোগ করিয়ে দিয়ে সাধারণ প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে আলাদাভাবে অর্থ আদায় করে থাকে। মূল টাকা দিয়ে ভর্তি করিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের অজান্তে তাদের নামে বিনামুল্যে ভর্তির আবেদন তৈরী করে মওকুফকৃত টাকা তার পকেটেই নিয়ে নেয়। সম্প্রতি সমাজসেবা অফিসের কর্মচারীর মৃত্যুর বিষয়ে তাদের শাস্তি দাবী করে ব্যানার ও পোষ্টারিং করা হয় ওই মুফিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
অফিস সহকারী মুফিজুল ইসলাম বলেন, আমি কোন ধরণের দুর্নীতির সাথে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা মিথ্যা। মামলার ব্যাপারে আমি শুনেছি। তবে এখনো কাগজপত্র হাতে পায়নি।
দুর্নীতির বিষয়ে শহর সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প পরিষদের সভাপতি এম.এম. সিরাজুল ইসলামের সাথে কথা বললে তিনি জানান, বিষয়গুলো আসলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার দেখার বিষয়। তবে আমি যেহেতু প্রকল্প পরিষদের দায়িত্বে আছি প্রকল্প বিষয়ে কোন সমস্যা হলে আমি ব্যবস্থা নিতে পারি। মামলার বিষয়ে আমি জানতাম না। দেখে এবিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পদক্ষেপ নেব।
এবিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-সহকারি পরিচালক প্রীতম কুমার চৌধুরী বলেন, শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহকারী মুফিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এটি আমার জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ-খবর নেয়া হবে। তার বিরুদ্ধে কোন ধরণের অভিযোগ কেউ যদি লিখিতভাবে দায়ের করে আমি ব্যবস্থা নিব।cd
- Blogger Comments
- Facebook Comments
Item Reviewed: কক্সবাজার সমাজসেবা কার্যালয়ে চলছে অনিয়ম-দুর্নীতি
Rating: 5
Reviewed By: Unknown