কক্সবার্তা ডেস্ক :
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে যাত্রীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ বিদেশে আসা-যাওয়ার সময় বেশি হয়রানির শিকার হন। তল্লাশির নামে লাগেজ খুলে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। তাছাড়া ঘাটে ঘাটে দিতে হয় ‘বকশিস’। অভিযোগ রয়েছে বৈধরা ভোগান্তিতে পড়লেও অবৈধরা অনায়াসে পার হয়ে যান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদেশ যাওয়ার সময় শুরুতে গেইট দিয়ে ঢুকে কাস্টমস স্ক্যানিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে লাগেজে অবৈধ মালামাল থাকার অজুহাতে টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিলে পার পাওয়া যায়, অন্যথায় নানাভাবে হয়রানি করা হয়। এমনকি লাগেজও খুলে ফেলা হয়। ফেলে দেয়া হয় মালামাল। ইমিগ্রেশনের কম্পিউটার ও এর সার্ভার আধুনিক নয়। বিদ্যুতের ভোল্টেজের ওঠানামায় সার্ভার বসে যায়। অনেক সময় সার্ভারে সমস্যা দেখা দেয়। তখন যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) রিডারের অভাবে পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাজগপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সময় লাগে প্রচুর।
অভিযোগ রয়েছে, বৈধ যাত্রীরা কর্মকর্তাদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হন। অপরদিকে রোহিঙ্গারা অবাধে যাতায়াত করেন। কারণ তাদের সাথে অলিখিত সমঝোতা থাকে। তবে সাম্প্রতিককালে এ হয়রানি কিছুটা কমেছে বলে জানা গেছে। কারণ আগে সিএমপি’র টিম ইমিগ্রেশনের দায়িত্ব পালন করতো। তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ ওঠায় পুরো টিম তুলে নিয়ে ঢাকা এসবি’র নিয়ন্ত্রণে দেয়া হয় ইমিগ্রেশন। তারপরও পুরো বন্ধ হয়নি যাত্রী হয়রানি। রোহিঙ্গারা এখনো বিদেশ পাড়ি দিচ্ছেন অনায়াসে।
সরজমিনে দেখা যায়, বিদেশ থেকে আসার সময় যাত্রীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। ইমিগ্রেশনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় যাত্রীদের। ধীরগতিতে চলে কার্যক্রম। ইমিগ্রেশনের পর লাগেজ পাওয়ার ক্ষেত্রেও হয়রানি। অন্যান্য দেশে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে লাগেজ মিলে যায়। কিন্তু শাহ আমানতে আধঘণ্টা বা একঘণ্টায়ও লাগেজ পাওয়া যায় না। এছাড়া লাগেজ খোয়া যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে লাগেজও মিলে না, ক্ষতিপূরণও মিলে না। জানা গেছে এক যাত্রী শারজাহ থেকে আসার পর খোয়া যাওয়া লাগেজের আংশিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন অন্তত ৯ মাস পর। লাগেজ খোয়া যাওয়ার ফলে শ্রমজীবী মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হন। লাগেজের ভেতরে থাকা মূল্যবান মালামালও খোয়া যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্বর্ণালংকার, মোবাইল সেটসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল কৌশলে নিয়ে ফেলেন কিছু অসাধু কর্মী।
এরপর কাস্টম চেকিং। দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় যাত্রীদের। সেখানেও হয়রানি। ক্ষেত্র বিশেষে মালামাল চেকিংয়ের নামে লাগেজ খুলে ফেলা হয়। বিদেশ থেকে ঘামের টাকায় আনা এসব মালামাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়। কাপড়-চোপড় বা অন্যান্য মালামাল মেজেতে রাখা হয়। পরে যাত্রীরা সেগুলো লাগেজে তুলে নিতে সীমাহীন কষ্টে পড়ে যান।
আবুধাবী থেকে আসা এক যাত্রী জানান, তাদের কাছে আমরা যেন অপাংতেয়। এমনভাবে দুর্বব্যহার করা হয় যেন আমরা বিদেশ গিয়ে অপরাধ করেছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানবন্দর ম্যানেজার রিয়াজুল কবির বলেন, যাত্রীদের হয়রানির কোন সুযোগ নেই। সব কিছুই নিয়ম মাফিক হয়ে থাকে। কোন যাত্রী যাতে হয়রানির শিকার না হন সেদিকে আমাদের সবসময় নজর থাকে। তবে কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে।
শুধু শ্রমজীবী মানুষ নয়, বিজিনেস ক্লাসের যাত্রীরাও লাগেজ সমস্যার সম্মুখীন হন। সারা বিশ্বে বিজনেস ক্লাসের যাত্রীরা আগে লাগেজ পেলেও শাহ আমানতে এর উল্টো। বিজনেস ক্লাসের যাত্রীরা তাদের মালামাল পাচ্ছেন অনেক বিলম্বে। সে ক্ষেত্রেও তারা নানামুখী হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সাধারণ যাত্রীরা কর্মকর্তাদের নির্দয় আচরণে প্রতিদিনই নানাভাবে নাস্তানাবুদ হচ্ছেন।
যাত্রীসাধারণের অভিযোগ, শাহ আমানত বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে। যাত্রীদের সেবা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশই উল্টো হয়রানি করছেন যাত্রীদের। দায়িত্ব পালন আর সেবার নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন টাকাকড়িসহ মূল্যবান সামগ্রী। রক্ষকরাই এখন ভক্ষকে রূপ নিয়েছেন। যত বেশি হয়রানি তত বেশি টাকা, এটা এখন এই বিমানবন্দরে পরিচিত সেøাগান। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি ছাড়াও রয়েছে ভিন্ন ধরনের হয়রানি। দিল্লীফেরত এক যাত্রী বলেন, দিলীø কাস্টমস-ইমিগ্রেশন কাগজপত্র ঠিক করতে জনপ্রতি সময় নেয় মাত্র এক থেকে পাঁচ মিনিট। আর একই কাজ করতে এখানে লাগে কমপক্ষে এক ঘণ্টা। এখানে কেউই যাত্রীসেবার জন্য নেই। ট্রলিও খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই অপেক্ষায় থাকেন বকশিস আদায়ের জন্য।
অভিযোগ রয়েছে, কাস্টম তল্লাশির পর বাইরে বেরুলে আবারো তল্লাশির মুখে পড়েন অনেক যাত্রী। বাইরে কর্মরত আর্মড পুলিশ, নিরাপত্তা কর্মীরা যাত্রীদের নানাভাবে হয়রানি করে। তারা যাত্রীদের লাগেজ বা দেহ তল্লাশি করে। ক্ষেত্র বিশেষে তাদের কাছে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার বা মোবাইল সেট হাতিয়ে নেয়।
সরকারি হয়রানি ছাড়াও বেসরকারি হয়রানির মুখেও পড়েন তারা। বাইরে অপেক্ষমাণ যানবাহনে তিনগুণ-চারগুণ বেশি ভাড়া আদায় করা হয়। দুইশ টাকার ভাড়ার ক্ষেত্রে ৮০০ বা ১০০০ টাকা আদায় করার অভিযোগও রয়েছে।
আবুধাবী বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ইফতেখার হোসেন বাবুল ও সাধারণ সম্পাদক নাছির তালুকদার এ প্রসঙ্গে বলেন, চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রয়েছেন। তারা কোটি কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। কিন্তু বিমানবন্দরে তাদের মানুষ বলেও গণ্য করা হয় না। তাদের সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করা হয়। কষ্টের টাকায় কেনা মালামাল তছনছ করা হয় বিনা কারণে। মূল্যবান মালামালও রেখে দেন। বিষয়টি সরকারের গুরুত্ব সহকারে দেখা প্রয়োজন। ac
- Blogger Comments
- Facebook Comments
Item Reviewed: চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে যাত্রীদের পদে পদে হয়রানি
Rating: 5
Reviewed By: Unknown