নিউজ ডেস্ক : বহুল আলোচিত গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের সরকার দলীয় এমপি মো. মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যার এক মাস ২০ দিন পর গতকাল মঙ্গলবার (২১ ফেব্রুয়ারি) এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
এমপি লিটনকে সরিয়ে পুনরায় ওই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার উচ্চাভিলাষ ও ক্ষমতার লোভেই জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খান এক বছর আগে থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে।
বুধবার সকালে গাইবান্ধা পুলিশ সুপার কার্যালয় চত্বরে প্রেস ব্রিফিং রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক জানান, সাবেক সাংসদ কাদের খান এমপি লিটনকে হত্যা করতে তার ঘনিষ্ঠ চার সহচর মেহেদী হাসান, শাহীন, হান্নান ও রানাকে প্রলুব্ধ করে এবং নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে তাদের ৬ মাসব্যাপী নানাভাবে প্রশিক্ষণ দেয়। তার ছক অনুযায়ী ইতোপূর্বে ঢাকা থেকে গাইবান্ধা আসার পথে এমপি লিটনকে গত অক্টোবর মাসে হত্যা করার পরিকল্পনা করে তা ব্যর্থ হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী রাস্তায় প্রথমে তার গাড়িতে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এতে গাড়ি থামিয়ে লিটন বের হয়ে আসা মাত্রই তাকে গুলি করে হত্যার পরিকল্পনা করে ওই কিলাররা। কিন্তু সে মিশনও ব্যর্থ হয়। পরে সর্বশেষ গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এমপি লিটনের নিজ বাড়িতে তাকে গুলি করে হত্যা করতে সক্ষম হয় কাদেরের ভাড়াটে কিলাররা।
ডিআইজি জানান, লিটন হত্যা মিশনে ৩ জন হত্যাকারী অংশ নেয়। তারা হলো- মেহেদী হাসান, শাহীন ও হান্নান। এরমধ্যে মেহেদী হাসান ৫ রাউন্ড গুলি ছুড়ে হত্যা নিশ্চিত করে। প্রথমে ৩ খুনি এমপি লিটনের সাথে জরুরি কথা আছে- এ কথা বলেই তার সাথে বৈঠকখানা ঘরে ঢোকে। সেখানে ঢুকেই তাকে সালাম দিয়েই ১ রাউন্ড গুলি ছোড়ে মেহেদী। এসময় লিটন হাত দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করে।
ফলে সে গুলিটি হাতে লাগে। যেহেতু এই খুনিরা পেশাদার কিলার ছিল না, সেজন্য প্রথম গুলিটি ব্যর্থ হলে খুনি মেহেদী ঘাবড়ে যায় এবং চোখ বন্ধ করে এলোপাতাড়ি ৪ রাউন্ড গুলি ছুড়ে। হত্যাকাণ্ড শেষে তাদের ব্যবহৃত ডায়াং ব্রাউন্সার রানার ১০০ সিসির কালো রংয়ের মোটর সাইকেলটিতে চড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
তিনি আরো জানান, খুনের কাজে ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি কাদের খানের নামে রেজিস্ট্রেশনকৃত এবং রেজিঃ বাবদ প্রদত্ত ফি জমা করা হয়েছে এমডি আলী নামে, যা পুলিশ জব্দ করেছে। এরপর রাস্তায় অপেক্ষমান কাদের খানের গাড়িতে কিলাররা বগুড়ায় তার বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে পরে খুনিরা বাসে ঢাকায় গিয়ে কাদের খানের সহযোগিতায় আত্মগোপন করে থাকে।
যেভাবে খুনিরা সনাক্ত হয়
এমপি লিটনের কিলাররা গত ২ জানুয়ারি গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কে ধোপাডাঙ্গায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ওই পিস্তলটি দিয়ে ফাহিম নামে এক যুবকের কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করে। ছিনতাই শেষে তাড়াহুড়া করে পালাতে গিয়ে পিস্তলের ৬ রাউন্ড বুলেটের ম্যাগাজিনটি তাদের অগোচরে রাস্তায় পড়ে যায়। পরে স্থানীয় জনগণের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তা উদ্ধার করে। এই পিস্তলের বুলেট পরীক্ষা করে দেখা যায় এমপি লিটনের শরীর থেকে অপারেশন করে বের করা এবং তার বাড়িতে হত্যার পর প্রাপ্ত বুলেটের খোসার সাথে ওই ম্যাগাজিনের বুলেটের মিল রয়েছে। পরে এই সূত্র ধরে খুনিদের আটক করা হয় এবং পিস্তলের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হয়।
ডিআইজি আরো জানান, গ্রেপ্তারকৃত তিন খুনি গতকাল মঙ্গলবার সুন্দরগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে খুনের ঘটনা স্বীকার করে এবং এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারি, অর্থ যোগানদাতা ও প্রশিক্ষণদাতা হিসেবেও আব্দুল কাদের খানের নাম উল্লেখ করে।
এদিকে খুনিরা কাদের খানের পিস্তলটি ব্যবহার করেছিল বলেই বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে ঢাকা থেকে প্রাপ্ত ব্যালিস্টিক পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর চূড়ান্তভাবে পিস্তলটির বিস্তারিত জানা যাবে।
সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি মুহাম্মদ আতিয়ার রহমান খুনিদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক কাদের খানের পিস্তল এবং বুলেট জব্দ করেন। কিন্তু ৪০ রাউন্ড বুলেট ক্রয় করলেও কাদের খান পুলিশকে মাত্র ১০ রাউন্ড বুলেট জমা দিতে সক্ষম হয়েছে। বাকি ৩০ রাউন্ড বুলেটের হিসাব সে দিতে পারেনি।
এদিকে জেলা জজ আদালতে সরকার পক্ষের পিপি অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম শফি বলেন, চাঞ্চল্যকর এমপি লিটন খুনের মামলাটি দ্রুত বিচারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সে কারণেই এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।rb.
- Blogger Comments
- Facebook Comments
Item Reviewed: যেভাবে এমপি লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন কাদের খান
Rating: 5
Reviewed By: Unknown