• Latest News

    "আমার পরিবেশ ভাবনা ও দেশপ্রেম"-[অভিষেক অভি]

    " যখন ছোট ছিলাম, বাসায় একটা বিড়াল ছিল। তাই খুব ছোট থেকেই বিড়ালের প্রতি একটা বিশেষ অনুভূতি কাজ করত। শুধু বিড়াল না, অন্য পশুপাখিদের প্রতিও একটা বিশেষ টান ছিল। ছোট থাকতেই বাসা থেকে জেনেছি বিভিন্ন পশুপাখি সম্পর্কে, গাছপালা সম্পর্কে। ডিসকভারি-ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে অনুষ্ঠানগুলো দেখতাম, ইংরেজি ভালোমতো না বুঝলেও শুধু গাছপালা-পশুপাখিগুলোকেই অনেক আগ্রহের সাথে দেখতাম। একটু বড় হয়ে এ বিষয়ে অনেক বই পড়েছি, পরিবেশ সম্পর্কে ভালোমতো জানতে চেষ্টা করেছি।
    খুব ছোট থেকেই একটা জিনিস দেখে আসছি – আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ পরিবেশের ব্যপারে একদমই চিন্তা করে না। "পশুপাখি দিয়ে হবে টা কী" – এ রকম চিন্তার মানুষ অনেক দেখেছি। প্রায়ই দেখি এলাকার রাস্তায় থাকা কুকুরগুলোর গায়ে কে বা কারা গরম পানি ঢেলে দিয়েছে, বা কোন কিছু দিয়ে ছ্যাকা দিয়েছে, বিড়ালগুলোর দিকে ছোট ছোট বাচ্চারা ঢিল ছুঁড়ছে আর খুব ব্যপারটা খুব উপভোগ করছে, পাখি বলতে তো কাক ছাড়া তেমন কিছুই চোখে পড়েনা, সেগুলোও রেহাই পায় না ঢিলের হাত থেকে। গাছপালার ব্যপারে এদেশের মানুষ আরও একধাপ এগিয়ে – কোথাকার জমির গাছ কেটে সেটা বিক্রি করা যায়, সেখানে কত বড় দালান বানানো যায়, এসব পরিকল্পনা আর তার বাস্তবায়ন তো চলছেই। ছোট থেকেই টেক্সটবইগুলোতে আমাদের শিক্ষা দেয় প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ কেন প্রয়োজন, কীভাবে পরিবেশ রক্ষা করতে হয়। আফসোস; এই শিক্ষা কেবল পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সমস্যাটা হলো, পরিবার থেকে যদি এ শিক্ষা না দেওয়া হয়, বাস্তবে এর প্রয়োগ আশা করা উচিত না। ছোটকালে 'ব্যাম্বি'র গল্প আমরা পড়েছি, সেখানে দেখানো হয়েছে বনের পশুপাখিদের উপর মানুষের তান্ডবের ঘটনা। আমরা খালি গল্পটা পড়েছি, বাস্তবে এর থেকে শিক্ষা নিতে পারি নি। এর শিক্ষা গ্রহণ করার মতো ক্ষমতা একটা শিশুর সরল মস্তিষ্কে থাকলেও আমাদের সমাজ ধীরে ধীরে তা নষ্ট করে দেয়। এদেশের মানুষের দরকার অর্থ-বিত্ত, পরিবেশ দিয়ে হবে টা কী! মাঝে মাঝে দেখি স্কুলগুলোতে বৃক্ষরোপন কর্মসূচি হয়, সরকারিভাবে বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপন হয়, পত্রিকা-টিভি চ্যানেলে সেগুলোর ছবি দেখানো হয়, কিন্তু যে সময় একটা গাছ লাগানো হয়, সে সময়েই তার পিছে কতগুলো গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, তা আড়ালেই থেকে যায়।
    বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারনে যেসব দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুকির মুখে রয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। একে তো এই সমস্যা, এর মধ্যে আমাদের দেশে বনভূমির পরিমানও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পরিবেশ রক্ষা করতে চাইলে বনভূমি রক্ষা কতটা প্রয়োজন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের বনের কথা বললে সবার আগে আসে সুন্দরবনের কথা। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ একক ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল আর প্রাকৃতিক বৈচিত্রের কারনে সারাবিশ্বে এ বন পরিচিত। বেশ কিছুদিন আগেও প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের সময় এদেশে সরকারের মধ্যে, মানুষের মুখে সুন্দরবন নিয়ে অনেক কথা শোনা যাচ্ছিল। পরিবেশগত দিক দিয়ে সুন্দরবন যেমন আমাদের দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, পর্যটনখাতেও এর গুরুত্ব অনেক। কিন্তু বন আছে বলেই শুধু অহংকার করলেই তো হবে না, একে সংরক্ষণের জন্যও অনেক কিছু করা দরকার। সে ব্যপারে আমাদের সরকার বা মানুষেরা কতটা সচেতন? আজ একটা জিনিস দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। সুন্দরবনের কাছে ১৩২০ মেগাওয়াটের(২x৬
    ৬০) কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকার ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে। আমার স্বল্পজ্ঞানে আমি যতটুক বুঝি, একটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশে অনেক দূষণ করতে পারে, বনের পাশে এটা করা হলে এটা বনভূমির ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। বিশ্বে বিদ্যুৎশক্তির শতকরা ৪১% উৎপাদিত হয় কয়লা থেকে, এর মধ্যে একটি ৫০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩৭ লক্ষ টন কার্বন-ডাইঅক্সাইড, ১০ হাজার টন সালফার ডাইঅক্সাইড, ৭২০ টন কার্বন মনোক্সাইডসহ আরো অনেক দূষনকারি পদার্থ নির্গত হচ্ছে [সূত্রঃ The Union of Concerned Scientists]। উন্নত দেশসমূহের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লোকালয় বা বনভূমি থেকে দূরে কোন স্থানে করা হয় যেন তার দূষণের প্রভাব কম হয়, আর সেখানে আমাদের দেশের প্রধান বন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে এ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে! এমনিতেই আমাদের বনভূমির পরিমান কমছে, পরিবেশের বারোটা বেজেই চলছে। পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃক্ষনিধন ইত্যাদি কারণে সুন্দরবন ধবংসের মুখে, তার উপর এরকম একটা সিদ্ধান্ত কীরূপ প্রভাব ফেলবে, তা রীতিমত চিন্তার বিষয়। ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমান পানি প্রয়োজন। পশুর নদী থেকে ঘন্টায় প্রায় ২৪/২৫ হাজার ঘনমিটার হারে পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হলে নদীর উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সেচ কাজে সমস্যা, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণির জীবনধারণে সমস্যা দেখা দেবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত দূষিত পানি নদীতে মিশে পশুর নদীর পানি দূষিত করবে, যার প্রভাব পড়বে সুন্দরবনের জীবকূলের উপর।
    দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ার ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর থেকে কেন্দ্রের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি টেনে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে এলাকাবাসীরা পানি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে প্রতিদিন কয়লা জ্বালাতে হয় ২.৪ হাজার টন, যা থেকে প্রতিদিন ৩০০ টন ছাই জমা হচ্ছে [সূত্রঃ প্রথম আলো,০৫.১২.২০১০]। এ হিসাব অনুযায়ী, সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সেখানে বছরে প্রায় ৭০ লক্ষ টন কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যাবহ্রত হলে ৩০ লক্ষ টন ছাই বর্জ্য উৎপাদিত হবে। এখন প্রশ্ন আসে ছাই ব্যাবস্থাপনার; বর্জ্য ছাই সঠিকভাবে রাখা না হলে তা থেকে বিষাক্ত ধাতব উপাদান মাটি ও পানির মারাত্বক দূষণ ঘটাতে পারে। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুতকেন্দ্রের সন্নিকটে দেখা যায় যে, বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত কালো পানি চারপাশের কৃষিজমিতে মিশে যাচ্ছে। কৃষিজমিগুলোর রং-ই পরিবর্তন হয়ে কালচে হয়ে গেছে এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে। একই ঘটনা যদি সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও ঘটে, পরিবেশের কী অবস্থা হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
    আমাদের দেশে বিদ্যুৎসমস্যা নিঃসন্দেহে অনেক বড় সমস্যা, এজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। পরিবেশের কম ক্ষতি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যে প্রযুক্তি ও সম্পদ প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে নেই। এজন্য প্রতি বছর অন্য দেশ থেকে পেট্রোলিয়াম ক্রয় করে উৎপাদন, অথবা বিদ্যুৎ ক্রয় করা হচ্ছে, যা অত্যান্ত ব্যয়বহুল। এজন্য নিজেদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানীর উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে, প্রাকৃতিক গ্যাসও দিন দিন অনেক কমে আসছে, এজন্য দূষণ হলেও জ্বালানি হিসেবে কয়লার ব্যবহার ছাড়া তেমন কোন উপায় নেই। কিন্তু তাই বলে কি অন্য কোথাও এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যেত না, বেঁছে ঠিক সুন্দরবনের পাশেই নিতে হলো??? কিছুদিন আগেও জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিল, আর সেই দেশেই ভূমিকার সাথে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে! অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, সুলতানা কামাল, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সহ ১২ জন বিশিষ্ট নাগরিক রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ বাতিলের আহ্বান জানিয়ে শুক্রবার এক বিবৃতি দিয়েছেন। এদেশের আরো কত মানুষ রয়েছে, এ প্রতিবাদে তাদেরও অংশ নিতে হবে। আমাদের দেশের মানুষের পরিবেশ সম্পর্কে অসচেতনতার কথা আগেই লিখেছি, তবু অন্তত সুন্দরবনকে দেশের সম্পদ মনে করে যেন তারা এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, সেটুক আশা করি। তবে এই প্রতিবাদ যেন শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিবাদ হয়।
    এ লেখাটির উদ্দেশ্য শুধু সুন্দরবন রক্ষার জন্য নয়, সমগ্র পরিবেশ রক্ষার জন্য। আজ সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়ায় ব্যপারটি সবাইকে নাড়া দিয়েছে, কিন্তু প্রতিদিন আমাদের চারপাশে যে ভাবে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, সে ব্যপারে কতজন সচেতন? আমাদের দেশের গাছপালা কমছে, কমছে পশুপাখিদের থাকার স্থানও। বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা-পশুপাখি দিন-দিন কমছে। তার উপর পশুপাখিগুলো হচ্ছে মানুষের অত্যাচারের শিকার। মানুষই পৃথিবীতে সব নয়, এই পশুপাখিগুলোরও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সবার কাছে অনুরোধ, প্লিজ, ওদের বাঁচার সুযোগ দিন, সুযোগ দিন যেন ওরাও স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারে। বর্তমানে অনেক উদ্ভিদ-প্রাণি বিলুপ্তপ্রায়, পরিবেশরক্ষার স্বার্থে অন্তত এগুলোকে রক্ষা করুন।
    • Blogger Comments
    • Facebook Comments
    Item Reviewed: "আমার পরিবেশ ভাবনা ও দেশপ্রেম"-[অভিষেক অভি] Rating: 5 Reviewed By: Unknown
    উপরে যান