• Latest News

    স্বামীর নির্যাতনে নষ্ট হওয়ার পথে সোমার দু’চোখ

    কক্সবার্তা ডেস্ক:
    আমার ১৭ বছরের সংসার জীবনে তিনটি সন্তান। কিন্তু হঠাৎই আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু হয়। স্বামী মাদকাসক্ত, মাদক কেনাবেচাতেও জড়িয়ে গেছে। ছেলে-মেয়ে, শশুরের সামনে আমাকে যৌন হয়রানি করতেও ছাড়েনি। তারপর আর এই পশুর সাথে আমি থাকতে পারি না। ও আমাকে বাঁচতে দেবে না। এরপর কী করব আমি? বাচ্চাদের নিয়ে কোথায় যাব?
    নিজের অসহায়ত্বের কথা এভাবেই বাংলা ট্রিবিউনের কাছে বলছিলেন গত দুই বছর ধরে ধারাবহিক নির্যাতনের শিকার সোমা সালমা। তিনি জানান, স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে এখন তিনি এক চোখে প্রায় দেখেনই না। অন্য চোখটিও নষ্ট হওয়ার পথে।
    গত মঙ্গলবার (২০ ডিসেম্বর) সোমা সালমা ফেসবুকে তার নির্যাতিত অবস্থার একটি ছবি পোস্ট করেন। তাতে তিনি লিখেন, 'প্লিজ হেল্প মি ইমিডিয়েটলি' (আমাকে যত দ্রুতসম্ভব সহায়তা করুন)। ফেসবুকের মাধ্যমে তার কথা জানতে পারে জাস্টিস ফর উইমেন বাংলাদেশ। সংগঠনটি খবর দেয় পুলিশকে। ওই দিনই দুপুরে সোমাকে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় তিনি শেকল দিয়ে বাধা ছিলেন। বর্তমানে সোমা চক্ষু ইনস্টিটিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
    পুলিশ বলছে, এই ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও তার স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। তিনি জেলও খেটে এসেছেন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আবার তারা একসঙ্গে থাকছেন।
    জাস্টিস ফর উইমেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ইফরীত জাহিন কুঞ্জ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমি নারী নির্যাতনের শিকার বিবাহিত নারীদের মানসিকতা বুঝতে চাই। একজন নারীর স্বামী তারই করা অভিযোগে জেল-হাজতে ছিল। স্বামী জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তার সঙ্গেই কেন আবার ওই নারী দাম্পত্য সম্পর্কে জড়াবেন? এই মানসিকতা বোঝা দরকার।'
    ইফরীত জাহিন আরও বলেন, 'বাঙালি নারীদের এই ধরনের সিদ্ধান্তের কারণেই স্বামীরা নির্যাতনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির সুযোগ পায়। এই আবেগের মায়াজাল থেকে বের না হয়ে আসতে পারলে নারীদের এমন নির্যাতনের শিকার হয়েই যেতে হবে।'
    এ ঘটনার কথা জানতে চাইলে রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার ইহসানুল ফিরদাউস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'দুপুরে (মঙ্গলবার) পুলিশ সোমা সালমাকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে আসে। তাকে চক্ষু ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। উদ্ধারের সময় তার পায়ে শেকল পরানো ছিল।'
    পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'এ ধরনের ঘটনা এই দম্পতির ক্ষেত্রে আগেও ঘটেছে। তারা বলতে গেলে এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এলাকার লোকজনও বিষয়টা জানেন।' রমনা থানায় সোমার স্বামীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলা ছিল বলে জানান তিনি।
    এদিকে সোমা ফেসবুকে সবার কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, 'এভাবেই কি শেষ হবো আমি? সহ্য করব না আর। অনেক করলাম কষ্ট। মুখ এবার থাকবে না বন্ধ। আমাকে এইখান থেকে উদ্ধার করো। তোমরাই আছো খালি আমার।'
    বুধবার সোমাকে চক্ষু হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় আরেক হাসপাতালে। নিরাপত্তার জন্য তিনি সেই ঠিকানা প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'গত কয়েকমাস আমাকে কেবল চোখে আর মাথায় আঘাত করেছে। আমি এখন বাম চোখে প্রায় দেখিই না। আরেকটি চোখও নষ্ট হওয়ার পথে।'
    বিষয়টি নিয়ে সোমার বা তার স্বামীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। জাস্টিস ফর উইমেন বাংলাদেশের কর্মী মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমাদের কথা হয়েছে তাদের সঙ্গে। সোমাকে পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়েছে। তার চোখের আঘাত মারাত্মক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন।'
    মানবাধিকারনেত্রী এলিনা খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমরা বারবারই একই ধরনের বিষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মেয়েটি বারবার নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তারপরও কেন ওই মেয়েকে ওই সংসারই করতে হবে? মেয়েটির পরিবার এই নির্যাতনের কথা জানে। তারপরও কেন তারা ওই মেয়েকে ওই সংসার করার জন্যই চাপ দেয়? সেই চাপ না থাকলে মেয়েটিই বা এভাবে সংসার টেকানোর কেন চেষ্টা করবে?'
    এলিনা খান বলেন, 'এ ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে একদম শেষ পর্যায়ে খোলামেলা কথা বলতে গেলে হেনস্তার শিকার হতে হয়। এর উদাহরণ অতীত থেকে আমরা দেখতে পাই। তারপরও এমন বিষয়ে সতর্ক না হওয়াটা খুব শঙ্কার।'
    • Blogger Comments
    • Facebook Comments
    Item Reviewed: স্বামীর নির্যাতনে নষ্ট হওয়ার পথে সোমার দু’চোখ Rating: 5 Reviewed By: Unknown
    উপরে যান