• Latest News

    খুটাখালী কিশলয় স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম: বিক্রি করা ৫শ বস্তা সিমেন্ট ও ঢেউটিন উদ্ধার

    মোঃ নিজাম উদ্দিন, চকরিয়া:
    চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতন স্কুলের চুরি হয়ে যাওয়া ৫০০ বস্তা সিমেন্ট ও ঢেউটিন উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল ৪ সেপ্টেম্বর সোমবার কিশলয় প্রাক্তন ছাত্র সংসদ (কিপ্রাছাস) স্থানীয় সদস্যদের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয় বলে জানা যায়। উদ্ধার কাজে সার্বিক সহযোগিতা করেন কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদ। কিন্তু কি করে চুরি হলো এসব মালামাল এনিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সঞ্চার হয়। এতে স্কুল কমিটির কারো সংস্লিষ্টতা আছে কিনা এনিয়েও আশংকা প্রকাশ করেন অনেকে। উদ্ধারকারীদের দাবী তদন্ত চালাকালিন রহস্যের জট সহসায় উন্মোচন হয়ে গেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির জড়িত থাকার প্রমাণের মাধ্যমে।

    ইতিপূর্বে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে লিখিত অভিযোগ করার পর তিনি আশ্বাস দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছেন মাত্র। কিন্তু পরবর্তীতে জেলা শিক্ষা অফিসের চিঠি পেয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার তদন্তের নির্দেশ দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির তদন্ত চলাকালীন সময়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির আবারো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

    আপনি এতকিছু থাকতে স্কুলের টিন এবং সিমেন্ট বিক্রি করেছেন কেন? এটা তো খুব লজ্জা ও অপমানজনক একটা বিষয়।  আপনি বললে প্রাক্তন ছাত্ররা চাঁদা তুলে আপনাকে বেতন দেওয়ার ব্যাবস্থা করে দিত। কিপ্রাছাস'র এসব প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন 'চুরি তো আমি নিজের জন্য করিনি, মাষ্টারদের ঈদ বোনাস দিতে না পেরে ৫০০ বস্তা সিমেন্ট এবং টিনগুলো আমি বিক্রি করেছিলাম। মামুন সাহেব ফেসবুকে স্কুলের বদনাম করায় স্কুলের সম্মান রক্ষা করতে আর কোন উপায় না দেখে টিনগুলো গোপনে বিক্রি করেছিলাম।'

    কিন্তু অবশেষে এখানেও থলের বিড়াল বেরিয়ে এলো। বর্তমান স্কুলে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১৭০০জন, তাদের মাসিক বেতনসহ অন্যান্য ফি নেই কোন কারো বাকেয়া, এরপরেও শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার জন্য স্কুলের আসবাবপত্র চুরি করে বিক্রি করতে হচ্ছে!

    এবিষয়ে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ম.ন. আবছার বলেন, উনি বিষয়টি কিপ্রাছাস'কে অবগত করলে আমরা প্রাক্তন ছাত্ররা চাঁদা তুলে শিক্ষকদের বেতন বোনাস দেওয়ার টাকা ব্যাবস্থা করে দিতাম। কিন্তু স্যারের উত্তর শুনে আমরা হতবাক। কিছুদিন আগে গনমাধ্যম খ্যাত ফেইসবুকে কক্সবাজারের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের সিনিয়র শিক্ষক মুমিনুল হক চোধুরি মামুনের স্টেটাস দৃষ্টচর হল ”আত্মীয়-স্বজন থেকে পাওয়া মাংসটুকু রান্না করার জন্য তেল মসল্লা যোগাড় করতে পারবো কিনা জানিনা” যাহা স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কখনো শুনিনি শিক্ষদের বেতন ভাতা বকেয়া আছে।

    স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক মুমিনুল হক চৌধুরি মামুন অভিযোগে জানান, কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতন পবিত্র ঈদ-উল আযহা উপলক্ষে ছুটি হয়ে গেল। পক্ষান্তরে কক্সবাজার জেলার স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের বাসায় ফিরতে হল খালি হাতে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জনাব নুরুল কবির স্যারকে বিনীতভাবে অনুরোধ করেছিলাম, এপ্রিল-১৭ হতে আগস্ট-১৭ পর্যন্ত ৫ (পাঁচ) মাসের প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বকেয়া সম্মানি প্রদান করতে না পারলেও অন্ততঃ ঈদ বোনাস হলেও প্রদান করুন। কারণ অনেক শিক্ষক কর্মচারী শুধু মাত্র প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানীর উপর নির্ভরশীল। তিনি সে অনুরোধটুকুও রাখলেন না। ফলে অনেকেরই কোরবানী করা সম্ভব হবেনা বলে হতাশ হয়ে পড়ে মাসের পর মাস বেতন বঞ্চিতরা। যে বেতন নিয়ে কুরবানি দেওয়ার আশায় অপেক্ষায় থাকে পুরো মাস সেই বেতনই পাচ্ছেন না বিগত ৫ মাস ধরে শিক্ষকরা। এমনকি আত্মীয়-স্বজন থেকে পাওয়া মাংসটুকু রান্না করার জন্য তেল মসল্লা যোগাড় করতে পারবো কিনা জানিনা। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের প্রতি শিক্ষক মুমিনুলের এই আকুলতা সবার মনকে নাড়া দিয়ে উঠে। উল্লেখ্য শিক্ষক মুমিনুল হক উক্ত স্কুলেরই সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সিনিয়র শিক্ষক নুর আহমদের সন্তান।

    নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিবাবক বলেন, শিক্ষকদের বেতন কিভাবে দেবেন তিনি? বেতন দিলে তো সদ্য কক্সবাজার সদরে বিলাস বহুল বাড়ি প্রাসাদ গড়ে তুলতে যদি বাধার সম্মুখীন হয়! বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির অদৃশ্য শক্তিবলে নিজের খুঁটিরজোর দেখিয়ে এ ধরনের অমানবিকতা, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানায় স্থানীয়রা। এ নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এখন সবার মনে প্রশ্ন একটাই- 'কবির মাষ্টারের খুঁটিরজোর কোথায় ?' 

    অনুসন্ধানে জানা যায়, এ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের রয়েছে নানা অভিযোগ। এ নিয়ে একাধিকবার ইউএনও ও জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হলেও অদৃশ্য শক্তিবলে ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কোন রকম ব্যবস্থা। এ অবস্থায় সচেতন অবিভাবকরা স্কুলটিতে তাদের সন্তানের ভাল পড়ালেখার মান নিয়েও আশংকা প্রকাশ করেন। অবিভাবক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবার মধ্যে এনিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

    অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির বিগত দুইবছর যাবত বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের কোন হিসাব বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির কাছে উপস্থাপন না করে ব্যক্তিগত সম্পদের মত ব্যবহার করে আসছেন। পরিচালনা কমিটির সভাপতি এ ব্যাপারে একাধিকবার তাগিদ দিলেও কোন সাড়া দেননি ওই প্রধান শিক্ষক।

    এ ব্যাপারে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাষ্টার রেজুর কাছে জানতে চাইলে বলেন- “প্রধান শিক্ষক নিজেই একটা সমস্যা। সৈরাচার সরকারের মত সবার সাথে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করছে। উনার এই অপশক্তির উৎস কোথায় তা নিয়ে সবাইকে ভাবাচ্ছে”। আরো উল্লেখ্য যে, বিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং এম.পি.ও ভূক্তির আবেদনে ঘুষের রমরমা বানিজ্য চলেছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।

    ওবাইদুল হক নামে এক শিক্ষক জানিয়েছেন,-‘ঘুষের টাকা দিইনি বলে আমি যোগ্য হয়েও এম.পি.ও ভূক্তির আবেদনে প্রধান শিক্ষক সুপারিশ করছেন না। আমার চেয়ে অযোগ্য এবং কম নাম্বার প্রাপ্ত সেকেন্ড ক্লাস শিক্ষক এমপিও ভূক্ত হয়ে গেছে। বিগত আট মাস যাবত ৮৫০ টাকা করে মাসে বেতন দেয় এবং তাও বন্ধ রেখেছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির স্যার। এ অবস্থায় একটা মানুষ কি করে বাঁচতে পারে!'

    উল্লেখিত বিষয়ে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবিরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন- ‘কতিপয় ব্যক্তিবর্গ আমার বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব অভিযোগ সত্য নয়। তাছাড়া শিক্ষক মুমিনুলের এভাবে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারনে স্কুলের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে'।

    সর্বস্তরের জনমনে একটিই প্রশ্ন, সময়ের একাধিকবার জেলার শীর্ষস্থান অবস্থানকারী কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতনে চলমান লুটপাট, চুরি, অনিয়ম, দুর্নীতির কি কোন বিচার হবে না ? 

    • Blogger Comments
    • Facebook Comments
    Item Reviewed: খুটাখালী কিশলয় স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম: বিক্রি করা ৫শ বস্তা সিমেন্ট ও ঢেউটিন উদ্ধার Rating: 5 Reviewed By: Unknown
    উপরে যান