• Latest News

    আশুরা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী


    ইউছুফ আরমান:
    আল্লাহ তায়ালার নিকট সম্মানিত চার মাসের এক মাস মহররম। মহররম হলো হিজরি সনের প্রথম মাস। Ashura আরবি ‘শাহরুন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে মাস, আর ‘মুহাররম’ শব্দের অর্থ সম্মানিত। সুতরাং ‘শাহরুল মুহাররম’ এর যৌগিক অর্থ হলো ‘সম্মানিত মাস।’ আরবি ‘মুহাররম’ থেকেই ‘মহররম’ শব্দটি বাংলা সাহিত্যে ও বাংলাভাষী মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়। সে যাই হোক, এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা ১২। যেদিন থেকে তিনি সব আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর সম্মান বিনষ্ট করে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।” (সুরা তাওবা : ৩৬)। এ মাসের দশ তারিখকে বলা হয় ‘আশুরা।’ কারণ আরবি ‘আশারা’ থেকে এর উৎপত্তি। যার অর্থ হচ্ছে দশ। তাই এ মাসের দশ তারিখ কে পবিত্র আশুরা বলে অবহিত করা হয়।

    আশুরা তাৎপর্যঃ- ১০ই মহররম হযরত আলী রা. এর নয়নমণি নবী তনয় ফাতিমার রা.-এর কলিব্জার টুকরা ইমাম হুসাইনের স্বপরিবারের উনিশজন সদস্যসহ তাঁর বাহাত্তরজন অনুসারীকে যেভাবে ইয়াজিদ বাহিনী কর্তৃক নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করতে হয়েছিল কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিমের হৃদয় কে রক্তে রঞ্জিত করবে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আর তাই মহররম মাসের আগমনে নতুন করে মুসলমানদের হৃদয়ের নিভৃতে মহররমের নির্মম স্মৃতি যেন সকল ঐতিহাসিক ঘটনাকে ম্লান করে দেয়। ঈমানদার মাত্রই এহেন নির্মম ঘটনায় মর্মাহত হবে এবং হওয়াই ঈমানের দাবী। আমাদের কিছু সংখ্যক অজ্ঞ মুসলমান কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনাকে স্মরণ করে নিজেদের মনগড়া কিছু কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে এই দিনের তাৎপর্যকে নষ্ট করে। ঐদিন তারা তাজিয়া তৈরি করে পথ ঘাটে বুক থাবরিয়ে মাতম করে। ইমাম হুসাইনের কৃত্রিম কবর তৈরি করে অনৈসলামিক ‘কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়।
    আদিকাল থেকেই যুগে যুগে এই আশুরার দিবসে বহু স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা আমরা পবিত্র কোরঅান ও হাদিস শরীফ থেকে জানতে পাই। হাদিসে এসেছে আল্লাহ রাববুল আলামিন যেদিন আকাশ, বাতাস, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, জান্নাত-জাহান্নাম, লাউহু মাহফুজ ও যাবতীয় সৃষ্টিজীবের আত্মা সৃজন করেছেন, সে দিনটি ছিল ১০ই মহররম তথা পবিত্র আশুরার দিবস। আবার এ দিনেরই কোনো এক জুমাবারে হযরত ইস্রাফিল অা. এর শিংগায় ফুঁ দিলে নেমে আসবে মহা প্রলয়। পবিত্র কোরঅানের ভাষায় যাকে বলা হয় কেয়ামত। এছাড়াও ইসলামের অারো অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে এ অাশুরাতেই। যেমন- এ দিনে আদি পিতা হযরত আদম আ. কে সৃষ্টি করা হয় , এ দিনেই হযরত আদম আ. কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় অাবার ভুলের কারণে তাদেরকে পৃথিবীতে প্রেরণের পর এ দিনই তাঁর তাওবা কবুল করা হয়। এমনিভাবে এ দিনে জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম আ. জন্মগ্রহণ করেন, আবার এদিনেই নমরুদের বিশাল অগ্নিকুন্ড হতে মুক্তিলাভ করেন। এই আশুরাতেই তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে হযরত মুসা আ. কথোপকথন ও আসমানী কিতাব ‘তাওরাত’ লাভ করেন, অাবার এই ১০ই মহররমেই জালেম ফেরাউনের দলবলসহ নীল দরিয়ায় সলিল সমাধি হয়। তদ্রূপ, হযরত নুহ আ. ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মহাপ্লাবন হতে মুক্তি লাভ, ৮০জন সহচর নিয়ে যেদিন নিরাপদে জুদী পর্বতে অবতরণ করেছিল সে দিনটিও ছিল ১০ই মহররম। হযরত ইউনুস আ. মাছের পেট হতে পরিত্রাণ, আসমান হতে বৃষ্টি বর্ষণের সূচনা। এভাবে হযরত ইউসুফ আ. কে কুপ থেকে উদ্ধার। আয়ুব আ. এর আরোগ্য লাভ। বরং ঐদিন অর্থাৎ ১০ইং মহররমেই হাশর ও কিয়ামত সংঘটিত হবে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। কাজেই এসব কিছুই সংঘটিত হয়েছে ১০ই মহররম অর্থাৎ আশুরার দিনে। মোট কথা এই ১০ই মহররম যেন ইতিহাসের এক জ্বলন্ত সাক্ষী।
    তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে এ দিনটির রয়েছে অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য। মহররম মাসের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস শরীফে বহু বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। অার এসব ফজিলতের আলোকে মুসলিম উম্মাহর জন্য এ মাসের সুনির্দিষ্ট আমল হলো ‘আশুরার সিয়াম।’ আমাদের প্রত্যেককেই ঐ দিনটির যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। আর তখনই মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে যখন আমরা এ মাসের ইতিহাসের প্রতি লক্ষ্য রেখে তা থেকে শিক্ষণীয় , বর্জনীয় ও করণীয় বিষয় এবং তার আদর্শ ও কার্যকলাপ আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রিয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে পারবো। তাই আসুন! পবিত্র এই অাশুরাকে মনগড়া কুসংস্কারে না ভাসিয়ে আশুরার প্রকৃত আমলকে নিজেদের জন্য পরকালের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করি।

    • Blogger Comments
    • Facebook Comments
    Item Reviewed: আশুরা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী Rating: 5 Reviewed By: Unknown
    উপরে যান