কক্সবার্তা ডেস্ক:
‘সরকারি হাসপাতালে তোমার বাপের চিকিৎসা শেষ। অহন ট্যাকা লইয়া প্রাইভেট হাসপাতালে আসলে স্যাররে বইল্যা অপারেশন কইরা হাতেপায়ে লোহার পাত বসাইয়া দিমু। সাতদিনের বেড ভাড়াসহ ট্যাকা লাগব ৪০ হাজার। ওষুধপত্র যা লাগে তুমি কিইন্যা দিবা। অহন বাড়ি গিয়া ট্যাকা লইয়া আসো।’
মঙ্গলবার দুপুরে মোবাইল ফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ তথ্যগুলো জানান লহ্মীপুরের কমলনগর থানার চরকাদিরা গ্রামের বাসিন্দা দরিদ্র মুদি দোকানি নুরুজ্জামান।
এক সপ্তাহ আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নুরুজ্জামানের বাবা নূর মোহাম্মদ (৬০) মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। তার হাত-পায়ের হাড়ও ভেঙে যায়। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে লহ্মীপুর থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হয়।
ঢামেক হাসপাতালে আনার পর সিটি স্ক্যান ও এক্সরে মাথায় রক্তক্ষরণ এবং হাত-পায়ের হাড় ভাঙার দৃশ্য ধরা পড়ে। মাথার আঘাত গুরুতর হওয়ায় প্রাথমিকভাবে ভাঙা হাত ও পায়ে প্লাস্টারের পর নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক সপ্তাহ চিকিৎসার পর মঙ্গলবার সকালে ওই বিভাগ থেকে রিলিজ দিয়ে অর্থোপেডিকস বিভাগে রেফার করা হয়।
অর্থোপেডিকস বিভাগে বাবার চিকিৎসা করাতে এসেই ভোগান্তিতে পড়েন নুরুজ্জামান। বৃদ্ধ বাবার হাত ও পায়ের হাড় টুকরো টুকরো হলেও ঢামেক হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগে ভর্তি না করে জনৈক ওয়ার্ড বয় স্যারের (ডাক্তারের) প্রাইভেট হাসপাতালে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে তাকে দেখা করতে বলেন।
নুরুজ্জামান এ প্রতিবেদককে প্রশ্ন করেন, হাত-পা কয় টুকরো হইলে তার বাবা সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসা পাইবেন।
তিনি জানান, এক সপ্তাহ আগে গ্রামের বাড়ির মসজিদে আসরের নামাজ পড়ে ফেরার পথে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার বাবাকে সজোরে ধাক্কা মারে। এতে তিনি মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। মোটরসাইকেলের ধাক্কায় তার হাত ও পায়ের হাড়ও ভেঙে যায়।
স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে গুরুতর আহত বাবাকে দ্রুত ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তিনি আরও জানান, বাবার চিকিৎসার জন্য ৩০ হাজার টাকা ঋণ এবং সঞ্চয়ের হাজার দশেক টাকা নিয়ে দুই ভাই ও দূর সম্পর্কের এক চাচাকে সঙ্গে নিয়ে এখানে আসেন।
মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ঢামেক হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের আউটডোরের বাইরে একটি স্ট্রেচারে বৃদ্ধ বাবাকে শুইয়ে চিকিৎসকের অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় নুরুজ্জামানকে। এ সময় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তাদের।
নুরুজ্জামান জানান, সকাল সাড়ে ৯টায় আউটডোরে আসেন। যে চিকিৎসকের কাছে রেফার করা হয়েছে তাকে রেফারের কাগজ দেখানোর পর অপেক্ষা করতে বলে বাইরে চলে যান। বেলা ১১টায়ও ওই চিকিৎসকের দেখা পাননি।
তিনি আরও জানান, ঢাকা শহরে তাদের কেউ নেই। এ সময় তিনি এক্সরের কাগজ বের করে তার বাবার হাত ও পা ভাঙার ইমেজ দেখান।
কৌতূহলবশত এ প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক তার বাবাকে দেখে কী বলেন, তা জানাতে মোবাইল নম্বর দিয়ে আসেন। বেলা আড়াইটায় নুরুজ্জামান ফোন করে জানান, চিকিৎসক তার বাবাকে দেখে ড্রেসিংয়ের কথা লিখে দিলেও ভর্তির কথা লেখেননি। চিকিৎসককে পরবর্তী চিকিৎসার অনুরোধ জানালে তিনি তার অফিস সহকারীর সঙ্গে আলাপের পরামর্শ দেন।
ডাক্তার সাহেব চলে যাওয়ার পর তার অফিস সহকারীর সঙ্গে দেখা করলে তিনি ৪০ হাজার টাকা নিয়ে স্যারের প্রাইভেট হাসপাতালে দেখা করার পরামর্শ দেন।
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে নুরুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সরকারি হাসপাতালে গরিবের চিকিৎসা নেই। বড়লোকদের তদবির করার লোক থাকে ফলে তারাই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ পান।
ভর্তির ব্যবস্থা না হলে বাবার চিকিৎসা অসম্পন্ন রেখেই তাদের বাড়ি ফিরতে হবে জানিয়ে জাগো নিউজের এ প্রতিবেদকের কাছে সহায়তা কামনা করেন তিনি।
nj//ফাইল ছবি
- Blogger Comments
- Facebook Comments
Item Reviewed: ‘৪০ হাজার ট্যাকা লইয়া স্যারের চেম্বারে আইসো’
Rating: 5
Reviewed By: Unknown