পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শনিবার মধ্যরাত থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে মালয়েশিয়া সরকার। প্রথম দিনেই আটক করা হয়েছে নারী-শিশু ও নিয়োগকর্তাসহ মোট ১ হাজার ৩৫ জনকে। আটককৃতদের প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশী। দেশটির অভিবাসন বিভাগের তথ্যমতে, এ সংখ্যা ৫১৫। খবর দ্য স্টার অনলাইন।মালয়েশিয়ার অভিবাসন দপ্তরের মহাপরিচালক দাতুক সেরি মুস্তফার আলি জানান, অভিযানের প্রথম দিন (১ জুলাই) দেশটির ১৫৫টি এলাকায় অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় মোট ৩ হাজার ৩৯৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর মধ্যে আটক করা হয়েছে ১ হাজার ৩৫ জনকে। আটককৃতদের মধ্যে তিনজন শিশু, ১০১ জন নারী এবং ১৬ জন নিয়োগকর্তা রয়েছেন।প্রথম দিনের অভিযানে আটক হয়েছেন ৫১৫ জন বাংলাদেশী নাগরিক। একক দেশ হিসেবে এটি সর্বোচ্চ। এছাড়া আটক করা হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার ১৩৫ জন, মিয়ানমারের ১০২ জন, ফিলিপাইনের ৫০ জন, থাইল্যান্ডের পাঁচজন ও ভিয়েতনামের দুজনকে। বাকিরা ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের নাগরিক। আটককৃতদের মধ্যে ১৬ জন নিয়োগকর্তাও রয়েছেন। নিয়ম ভেঙে অবৈধ অভিবাসীদের কাজে নিয়োগ ও আশ্রয়দানের অভিযোগে তাদের আটক করা হয়।মুস্তফার আলি জানান, আটককৃতদের কারো কাছেই মালয়েশিয়া আসার বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। মালয়েশিয়া সরকারের দেয়া এনফোর্সমেন্ট কার্ড (ই-কার্ড) বা সাময়িক অবস্থানের অনুমতিপত্রের জন্যও তারা আবেদন করেননি।এর আগে অবৈধ অভিবাসীদের নিয়োগকে সাময়িকভাবে বৈধতা দেয়ার উদ্যোগ নেয় মালয়েশিয়া সরকার। এজন্য তাদের নামে বিনামূল্যে ই-কার্ড ইস্যু করা হয়। বৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার নথিপত্র দেখাতে পারলে এ কার্ড দেয়া হতো। ই-কার্ডধারীরা প্রাথমিকভাবে ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় অবস্থান ও কাজ করার সুযোগ পাবেন।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে ই-কার্ড নিবন্ধন শুরু হয়। নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হয় ৩০ জুন মধ্যরাতে। কিন্তু এ প্রকল্পে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। শুরুতে চার থেকে ছয় লাখ ই-কার্ড নিবন্ধনের লক্ষ্য ঘোষণা করে মালয়েশিয়া সরকার। অধীনস্থ অবৈধ শ্রমিকদের নিবন্ধনের জন্য নিয়োগকর্তাদের যথেষ্ট সময় ও সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন মোট ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৪৬ জন অভিবাসী, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের মাত্র ২৩ শতাংশ। নিবন্ধনের এ নিম্নহারে হতাশা প্রকাশ করেন মুস্তফার আলি। সময়সীমা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অবৈধ অভিবাসীদের আটকে সারা দেশে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘কারো অভিযোগ তোলার আর সুযোগ নেই। আমরা যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু নিয়োগকর্তারা তা গ্রহণ করেননি।’ ঘোষণা অনুযায়ী ১ জুলাই শনিবার মধ্যরাতে মালয়েশিয়ার অভিবাসন দপ্তর দেশব্যাপী অভিযান শুরু করে। রাজধানী পুত্রজায়ায় অভিবাসন সদর দপ্তর থেকে বড় এক গাড়িবহর দেশটির বিভিন্ন স্থানে হানা দেয়। কাপার এলাকার জালান জাতি কিরিতে কর্মরত শ্রমিকদের একটি ডরমিটরিতে তল্লাশি চালায় মুস্তফার আলির নেতৃত্বে ৮৬ জন কর্মকর্তার একটি টিম। সেখানে ২৩৯ জন অভিবাসী শ্রমিক ছিলেন। অনুসন্ধানে তাদের ৫১ জনের কাছে বৈধ কোনো কাগজপত্র মেলেনি। তাদের আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের অধিকাংশই বাংলাদেশী। তারা পাশের আসবাবপত্র ও প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করতেন। এছাড়া জোহর বারু এলাকায় ১৭৫ জন, আলোর সেতার এলাকায় পাঁচজন, কোটা ভারুতে ১৩২ জন, মেলাকা এলাকায় ১১ জন, ইপোহতে একজন, কুয়ানতান এলাকায় চারজন ও সেরেমবানে একজন অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীকে আটক করা হয়। এর বাইরে কেলানতান, পেরাক, পেনাং, নাগেরি সেমবিলান ও কোটা কিনাবালু থেকেও কিছু অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয় বলে দ্য মালয় অনলাইন জানিয়েছে। অভিযান চলাকালে মিয়ানমারের একজন নারী শ্রমিক কর্মকর্তাদের জানান, তিনি ই-কার্ড গ্রহণের সময়সীমার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তার নিয়োগকর্তা কয়েকজনকে কার্ড সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তবে সবাই সেটা পাননি। এমনকি এ বিষয়ে চিন্তা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তার নিয়োগকর্তা। শনিবার রাতে মালয়েশিয়ার অভিবাসন দপ্তর মোট ১৫৫টি এলাকায় অভিযান ও তল্লাশি চালিয়েছে। এখন থেকে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান মুস্তফার আলি। মালয়েশীয় কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত সময় দেয়ার পরেও অনেক অভিবাসী শ্রমিক ই-কার্ড সংগ্রহ করেননি। অভিযানের সময় এজন্য তারা বিভিন্ন কারণ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ বলছেন, তারা আবেদনের সময়সীমা সম্পর্কে জানতেন না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, সময়সীমা বাড়ানো হবে বলে নিয়োগকর্তারা আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু তাদের সুযোগ শেষ হয়ে গেছে। এখন আর বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়া হবে না।