ডেস্ক রিপোর্ট :
২৮ মার্চ রাত সাড়ে ১২টা। হোটেলের ৭০২ নম্বর কক্ষে তিন ধর্ষক একযোগে ইয়াবা সেবন শুরু করেন। ফলে হোটেলের ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র (স্মোক ডিটেকশন সিস্টেম) বেশ কয়েকবার সিগন্যালও দেয়। হোটেলের ধূমপানমুক্ত কক্ষে ধোঁয়ার উপস্থিতির বিষয়টি টের পান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু কেউই খোঁজ নিতে ওই কক্ষে যাননি বা যাওয়ার সাহস পাননি। কারণ ধর্ষকরা সবাই ছিলেন খোদ হোটেল মালিকের বন্ধু। এ কারণে তারা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হোটেল কক্ষে প্রবেশের সুযোগ পান।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বনানী রেইনট্রি হোটেলের একাধিক কর্মচারী এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। ঘটনার রাতে ধর্ষকদের ইয়াবা সেবন ও মদপানের বিষয়ে ওই রাতে কর্তব্যরত মোট ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশকে তারা বলেন- ‘ওরা সবাই এমডি স্যারের বন্ধু। তাই অস্ত্র নিয়েই তারা রুমে চলে যান। গেটে তাদের আটকানো হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী তাদের দেহ তল্লাশিও করা হয়নি। এদিকে অবৈধ মদ ব্যবসার অভিযোগে শনিবার দুপুরে রেইনট্রিতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
রাজধানীর বনানীতে তরুণী ধর্ষণ মামলার ঘটনাস্থল ২৭ নম্বর রোডের ৪৯ নম্বর প্লটে অবস্থিত বহুতল রেইনট্রি নামের হোটেল। সরকার দলের প্রভাবশালী এমপি বিএইচ হারুনের তিন ছেলে এ হোটেলের মালিক। তার মেজ ছেলে আদনান হারুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে হোটেলটি পরিচালনা করেন। বড় ছেলে নাহিয়ান হারুন ও ছোট ছেলে মাহির হারুন হোটেলের অন্যতম পরিচালক। অবৈধ মদের ব্যবসা : রেইনট্রি হোটেলে মদের বার লাইসেন্স নেই। আইন অনুযায়ী সেখানে সব ধরনের মদ ও মদজাতীয় পানীয় সরবরাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রভাবশালীর হোটেল বলে কথা। তাই লাইসেন্স না থাকলেও হোটেলে বিদেশি মদের জমজমাট ব্যবসা চলছিল। ধর্ষকরা ২৮ মার্চ সন্ধ্যা সাতটা থেকেই ৭০১ নম্বর কক্ষে বিদেশি মদের একাধিক বোতল খুলে বসেন। মদের নেশায় বুঁদ হয়ে তারা দুই তরুণীকে আটকে আদিম বর্বরতায় মেতে ওঠেন। সূত্র জানায়, রেইনট্রি হোটেলটি ৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের অনেক আগে থেকেই সেখানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলছিল। হোটেলের সেবা তালিকায় সুইমিংপুল ও স্পা সার্ভিসের পাশাপাশি বার সুবিধার কথা লেখা রয়েছে। অথচ সেখানে বৈধ বারের লাইসেন্স নেই।
সূত্র জানায়, রেইনট্রিসহ বনানী ও গুলশানের বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে মদ সরবরাহ করেন বিদেশি মদের কালোবাজারি হিসেবে পরিচিত বনানীর আতা। মাসে দু’বার তিনি রেইনট্রিতে মদের চালান সরবরাহ করতেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গুলশান সার্কেলের সাবেক এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ধর্ষণ কেলেংকারির কারণে রেইনট্রি হোটেলের মদ ব্যবসার গোমর ফাঁস হলেও গুলশান বনানীতে এমন হোটেলের সংখ্যা ভূরি ভূরি। অবৈধ মদ ব্যবসার অভিযোগে শনিবার দুপুরে রেইনট্রিতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। অধিদফতরের গুলশান সার্কেলের ইন্সপেক্টর ওবায়দুল কবিরের নেতৃত্বে একটি টিম হোটেলের অভ্যন্তরে ২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তল্লাশি চালায়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইন্সপেক্টর ওবায়দুল কবির যুগান্তরকে বলেন, ‘রেইনট্রি হোটেলে অবৈধ মদের বার পরিচালনা করা হচ্ছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অভিযান চালিয়েছি। তবে অভিযানে কোনো মদ বা মদজাতীয় পানীয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি বলেন, আমরা হোটেলটির ওপর কড়া নজর রাখছি। এক বোতল মদ পেলেও তাদের ছাড়ব না।
সেখানে অবৈধ বার পরিচালনার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন) তৌফিক উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, ‘রাজধানীতে মোট ৫২টি প্রতিষ্ঠানের বার পরিচালনার অনুমোদন রয়েছে। সেই তালিকায় রেইনট্রি নামের কোনো হোটেল নেই।’ তবে অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম কিবরিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘হোটেলটির বিরুদ্ধে মাদক বিক্রি ও সরবরাহের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
ধর্ষকরা ছিলেন ভিআইপি গেস্ট : তরুণী ধর্ষণ কাণ্ডের পর সাংবাদিক, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বনানীর রেইনট্রি হোটেল ও তার আশপাশে এখন সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছেন। শনিবার হোটেলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ‘দুজন অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী কালো প্যান্ট ও খয়েরি কোট পরে হোটেল ভবনের সামনে ডিউটি করছেন। তাদের একজনের হাতে ছিল প্রায় নতুন একটা শটগান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, তিনি সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। অস্ত্রটি তার ব্যক্তিগত। ধর্ষণ মামলার পর থেকে তারা দু’জন অস্ত্র হাতে ২৪ ঘণ্টা হোটেলের সামনে ডিউটি করছেন।
হোটেলের প্রবেশ ফটকে স্বয়ংক্রিয় কাচের দরজা লাগানো। সেখানেও দু’জন বেয়ারা মেটাল ডিটেক্টর হাতে দাঁড়িয়ে। ফটকের সামনে দেহ তল্লাশির জন্য আর্চওয়ে বসানো হয়েছে। গেটের এক পাশে বড়সড় ডিজিটাল স্ক্যানার মেশিন। এতসব নিরাপত্তা সরঞ্জামের মধ্যেও ধর্ষকরা অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে কোনো বাধা পায়নি। অথচ গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পর কূটনৈতিকপাড়ার নিরাপত্তার স্বার্থে সব ধরনের বৈধ অস্ত্র বহনের ওপর কড়াকড়ি করছে পুলিশ। কিন্তু ধর্ষকদের বেলায় পুলিশের সেই কড়াকড়ি কাজে আসেনি।
সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী হোটেলে আগত প্রত্যেক অতিথিকে কক্ষ দেয়ার আগে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এ সময় জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হয়। এছাড়া ৩ তারকা বা তার ওপরের মানের হোটেল হলে এই রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াটি আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করে কর্তৃপক্ষ। নিয়মানুযায়ী হোটেলে অবস্থানরত অতিথিদের নামের তালিকা রাত ১২টার মধ্যে নিকটস্থ থানায় পাঠানোর বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষ ধর্ষকদের ক্ষেত্রে এসব কোনো আনুষ্ঠানিকতা পালন করেনি। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোটেলের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এমডি স্যারের বন্ধু হিসেবে তারা ভিআইপি গেস্টে’র মর্যাদা পেতেন। কারণ তারা আসার আগে এমডি স্যার বা তার ছোট ভাইকে ফোন করে আসতেন। স্যারদের নামেই তাদের রুম দেয়া হতো। তাদের কাছে কোনো বিলও নেয়া হতো না। এ প্রসঙ্গে হোটেলের মালিক পক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে ম্যানেজার ফারজানা রিমি বলেন, হোটেলের এমডি বা মালিক পক্ষের কেউ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন না। তবে পুলিশের কাছে এ সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া হয়েছে। পুলিশের লোকজন হোটেলের কম্পিউটার থেকে গেস্ট লিস্ট জব্দ করে নিয়ে গেছে।
আর্তচিৎকারেও এগিয়ে আসেনি কেউ : ধর্ষণ মামলার পর হোটেলে সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করতে গিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কারণ হোটেলের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঘটনার দিনের ভিডিওচিত্র তাদের কাছে সংরক্ষিত নেই। হোটেলের এমন বক্তব্যে রহস্য ঘনিয়ে আসে। পুলিশ ভিডিও ফুটেজ না পেয়ে হোটেলের সিসি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি জব্দ করে। তবে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণী যুগান্তরকে বলেন, হোটেল কর্র্র্তৃপক্ষের সাহায্য পেলে তারা ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পেতেন। কারণ ঘটনার রাতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার আর কান্নাকাটি করলেও হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেননি। অথচ ৭০১ ও ৭০২ নম্বর কক্ষে দুই বেয়ারা সার্বক্ষণিক সেবা দেন। মদ সরবরাহসহ সবকিছুর দেখভাল করেন তারা।
গভীর রাতে রুমে এসে ধর্ষকদের সঙ্গে দেখা করে যান এমপি হারুনের ছেলে মাহিন হারুন। এ সময় ধর্ষকরা বলেন, ‘ও আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওর বাবা এমপি। এটা ওদের হোটেল। এখানে কেউ আমাদের কিচ্ছু বলবে না।’ রাতভর নির্যাতন শেষে সকালে দুই তরুণী কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটিও করেন। অথচ মামলার পর হোটেলের সংশ্লিষ্ট কর্মচারী পুলিশের কাছে মিথ্যা সাক্ষ্য দেন। হোটেলের পক্ষ থেকে বলা হয় ‘খুব সকালে দুই তরুণী হাসিমুখে হোটেল থেকে বেরিয়ে গেছেন।’
মদ ব্যবসা ও ধর্ষকদের তথ্য নিবন্ধন না করার বিষয়ে জানতে চাইলে হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার ফ্রাংক ফরগেট যুগান্তরকে বলেন, উদ্ভূত ঘটনায় অনেক ধরনের ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আসলে তারা পরিস্থিতির শিকার। তিনি দাবি করেন, পরিচিত গেস্ট হওয়ায় তাদের তথ্য নেয়া হয়নি। তবে তারা ভিজিটিং কার্ড জমা দিয়ে হোটেলে ঢুকেছিলেন।
- Blogger Comments
- Facebook Comments
Item Reviewed: ইয়াবার ধোঁয়া শনাক্ত হলেও নির্বিকার ছিল কর্তৃপক্ষ
Rating: 5
Reviewed By: Unknown