বাংলা ট্রিবিউন:
‘জ্যান্ত ছাগলের চেয়ে মরা ছাগলের কত শক্তি! জীবিত অবস্থায় ছাগলের জন্য ওষুধ পাওয়াই ছিল দায়। রোগাক্রান্ত ছোট্ট একটি ছাগল বাড়িতে আনার দিনই রাতে মরে গেল। জ্যান্ত ছাগল দেখতে প্রতিবেশীরাও আসেনি। চাচারও খোঁজ নেয়নি। মরার পর তা হলো আলোচিত খবর। মরা ছাগল ফেললাম পাশের এই খালে। পরদিন জানলাম, ওই ছাগল নিয়ে লিখে সাংবাদিক জেলে গেল।’ এই কথাগুলো বলছিলেন ডুমুরিয়ায় আলোচিত মৃত ছাগলের মালিক জুলফিকার আলী ঢালীর ভাতিজি আফসানা।
বুধবার (২ আগস্ট) সকালে ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের দক্ষিণ ডুমুরিয়ার ঝিলেরডাঙ্গা খা পাড়ায় জুলফিকারের বাড়িতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন।
আফসানা মরা ছাগলের তুলে রাখা একটি ছবি দেখান। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ছাগল মরার এ খবর সাংবাদিকরে দিলো কে? ছাগল পাওয়ার খবর তো তারা দেয়নি।’ তিনি বলেন, ‘বাড়ির এই বিলের পাশ দিয়ে যাওয়া ওই খালেই পরদিন সকালে ছাগলটি ফেলে দেওয়া হয়। এর আগে ছাগল মরার খবর পেয়ে পশু হাসপাতালের লোকজন এসে দেখে যায়।’
ডুমুরিয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘রোগাক্রান্ত ছাগলটিকে এখান থেকেই ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২৯ জুলাই রাতে সেটি মারা যায়। ৩০ জুলাই সকালে ভ্যাটেরেনারি চিকিৎসক সেখানে যান এবং মরা ছাগলটি দেখে আসেন। এরপর জুলফিকারের পরিবারের লোকজন ছাগলটিকে পাশের খালে ফেলে দেয়। যদিও ছাগলটিকে মাটি চাপা দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি।’
ডুমুরিয়ার ভ্যানচালক আতিয়ার রহমান বলেন, ‘এক ছাগল নিয়ে এত বড় ঘটনা হতে পারে ভাবাই যায় না। বিশ্বজুড়েই আজ মরা ছাগল ও লতিফ সাংবাদিক নিয়ে আলোচনা!’
স্থানীয় বাসিন্দা মিল্টন শেখ বলেন, ‘ছাগল নিয়ে নিজেদের মধ্যে এমন কাণ্ড হওয়া অনুচিৎ।’ তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানান।
ডুমুরিয়ার সাংবাদিক এম এরশাদ বলেন, ‘লতিফের গ্রেফতার হওয়া উপজেলাবাসী মেনে নিতে পারছে না। লতিফের পক্ষে প্রতিবাদ ও নিন্দা কর্মসূচি পালনের প্রক্রিয়া চলছে। লতিফকে রাতে থানায় নেওয়ার পর সকালে তার পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে থানায় যান। কিন্তু পুলিশ সেখানে কলাপসিবল গেট আটকে রেখে সাক্ষাতে বাধা দেয়। নাস্তা পর্যন্ত করাতে দিতে চায়নি।’
তবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আমি ডুমুরিয়ায় ছাগল ও হাঁস মুরগি বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলাম। টোকেন হিসেবে একটি ছাগল বিতরণও করেছি। তবে যে ছাগলটি বিতরণ করেছি, সেই ছাগলটি মরে নাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর এই ছাগল নিয়ে দেওয়া স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে আমার কোনও সম্পর্ক নাই। যিনি মামলা করেছেন তিনিও একজন সাংবাদিক।’
বাদী সুব্রত ফৌজদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘ ছাগলের মৃত্যু তো বড় বিষয় নয়। ওই স্ট্যাটাসের সঙ্গে মন্ত্রীর একটি ছবি দেওয়া হয়েছে। মৃত ছাগলের ছবি দেওয়া যেত। ছাগলের মালিকের ছবি দেওয়া যেত। কিন্তু মন্ত্রীর ছবি কেন? এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে আমি মামলা দায়ের করেছি।’
গত ২৯ জুলাই খুলনার ডুমুরিয়ায় এফসিডিআই প্রকল্পের আওতায় প্রাণিসম্পদ অধিদফতর কিছু পরিবারের মধ্যে হাঁস, মুরগি ও ছাগল বিতরণ করে। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। এরপর দৈনিক প্রবাহের ডুমুরিয়া প্রতিনিধি আ. লতিফ মোড়ল ‘প্রতিমন্ত্রীর সকালে বিতরণ করা ছাগল রাতে মৃত্যু’ লিখে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় ডুমুরিয়া থানায় ৩১ জুলাই মামলা করেন যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্পন্দন পত্রিকার ডুমুরিয়া প্রতিনিধি সুব্রত কুমার ফৌজদার। এরপর সোমবার (৩১ জুলাই) মধ্যরাতেই বাড়িতে গিয়ে ঘুম থেকে তুলে লতিফকে গ্রেফতার করা হয়। মঙ্গলবার (১ আগস্ট) এই মামলায় আ. লতিফকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে আজ (বুধবার) তিনি জামিন পেয়েছেন। মন্ত্রীসহ এই তিন জনের বাড়িই ডুমুরিয়ায়।
খুলনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত ‘খ’ অঞ্চলের বিচারক নুসরাত জাবিন শুনানি শেষে বুধবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তার অন্তর্বর্তীকালীন এ জামিন মঞ্জুরের আদেশ দেন। আ. লতিফের পক্ষের আইনজীবী ১০ হাজার টাকার বন্ড প্রদানের মাধ্যমে তা মঞ্জুর হয়। আদেশে এ মামলার চার্জশিট দাখিল না হওয়া পর্যন্ত তার জামিন বহাল থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিক আব্দুল লতিফের পক্ষের আইনজীবী মতিয়ার রহমান মোল্লা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘বুধবার আব্দুল লতিফকে আদালতে হাজির করা হয়নি। আদালতে শুনানির মাধ্যমে তার জামিন আদেশ নেওয়া হয়েছে। এ আদেশের কপি কারাগারে পৌঁছানোর পরই তিনি মুক্ত হবেন।’
- Blogger Comments
- Facebook Comments
Item Reviewed: মরা ছাগল খালে, সাংবাদিক ৫৭ ধারার জালে
Rating: 5
Reviewed By: Unknown