মোঃ নিজাম উদ্দিন, চকরিয়া :
'আমারও স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে, বড় হতে মন চায়। কিন্তু মায়ের অসুখের জন্য পড়ালেখা করতে পারি না। চাকরি করছি বেতনের টাকা যা পাই মায়ের টিউমার চিকিৎসায় দিয়ে দিই।' তাপদাহ গরমের সময় কথাগুলো বলেন ৭বছর বয়সী শিশু এহেসান।
সে চকোরিয়া খুটাখালী ইউনিয়নের হরিখোলা গোলঢেফা নামক এলাকার দিন মজুর আব্দুর রশিদের পুত্র। তার মা খালেদা আক্তার দীর্ঘকাল থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে একাধিক টিউমারে আক্রান্ত। অপরদিকে স্ত্রীর প্রতি হাজারও ভালবাসা থাকলেও অর্থের কাছে হার মানতে হচ্ছে স্বামী রশিদের। তার বড় ছেলে রায়হান ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করে মুদির দোকানে চাকরি করতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে সেদিন একাকী পাড়ি দিই এক অজানা পথে। আমি ও সাথে বাইকটি আর নিজের তীব্র মনোবল। খুটাখালীর পূর্বে বালু মহাল ও কয়েকটি নদী পার হয়ে এসে পড়ি দিচ্ছি অনেক দুরে। নিজেও বুঝতে পারলম না কোথায় আসলা, কতটুকু আসলাম। শুধু ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। তাপদাহ গরমে মন চায় যেন জিহ্বাটা একটু পানি দিয়ে ভেজাই, কিন্তু এখানে তাও সম্ভব না। চতুর্দিক নিরব-নিস্তব্ধ সড়কের উভয় পাশে গভীর জঙ্গল। পরে বুঝতে পারছি অনেক অনেক দূরত্ব অতিক্রম করে গভীর অরণ্যের ভেতরেই এসে পড়ছি। খানিকটা ভয়ও স্থান পাচ্ছে মনে। কেননা শুনেছি ওসব বনাঞ্চলে হাতির উপদ্রব খুব বেশি। যাই হউক সামনে এগুতেই আছি আমি। অবশেষে আরো অনেকদূর এগিয়ে চলে আসলাম একটি নদীর কিনারায়।
দেখতে পাই দুপুরের এই তাপদাহ গরমে নদীর পাড়ে ৭বছরের এক শিশু বসে আছে একা একা। প্রথমে দেখে একটু অস্বস্তি লাগলেও পরে স্বাভাবিক হয়ে যাই। গায়ে জামাবিহীন, মাথায় গামছা পেঁচানো, হাফ পেন্ট পরা ওই ছেলেটিকে কাছে ডাকলাম। একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকানোর পর এগিয়ে আসল ছেলেটি। জানতে পারি ৭বছর বয়সী ছেলে এই এহেসান উপরোক্ত দিনমজুর আব্দুর রশিদের দ্বিতীয় পুত্র। তার সাথে যতই কথা বলছি ততই অভাক হচ্ছি। জানতে পারি এই তাপদাহ গরম, গভীর অরণ্যে হাতির ভয় তার মায়ের ভালবাসার কাছে কিছুই না। খানিকটা ভয় লাগলেও তার মা অসুস্থের কথা ভেবে ভুলে যায় সে। তার মা খালেদা বেগম শরীরের বিভিন্ন অংশে একাধিক টিউমার হয়ে বান্দরবান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকটি পরীক্ষা দিতে তাকে বর্তমানে নিয়ে যেতে হয়েছে চট্টগ্রাম শহরে। অবশ্য দেখাশুনা করতে পাশে থাকলেও এতটাকা খরচ বহন করা তার মামা স্থানীয় কালা পাড়া গ্রামের মোঃ আমিন মৌলবির পক্ষে সম্ভব নয়। স্থানীয় মানুষের আর্থিক সহযোগীতায় প্রায় ১১ হাজার টাকা উত্তোলন হলেও এহেসানের মায়ের ৯টি টিউমার অপারেশনে সম্ভব হচ্ছে না। এর আগেও তার মা একই রোগে আক্রান্ত হলে শান্ত প্রকৃতির শিশু এহেসান স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়।
এখন ওই চিকিৎসার যোগান দিতে তার বড় ভাই করছে মুদীর দোকানে চাকরি, বাবা দিনমজুরী কাজ এবং এই এহেসান গভীর ভিতরে বালু মহাল পাহারাদারি চাকরি। তার কাজটি হলো বাহির থেকে ওই খালে বালি উত্তোলনে কোন ট্রাক প্রবেশ করলে বাধা দেওয়া। তাকে তুমি ছোট তুমার কথায় ওরা শুনবে? উত্তরে অনেক দুরে বালু উত্তোলনকারী শ্রমিকদের ইঙ্গিত করে বলে, ওখানে গিয়ে একটি নাম্বার আমার মুখস্থ আছে ওই নাম্বারে ফোন করে দিই। এভাবে শত যন্ত্রণা উপেক্ষা ও জীবন বাজী রেখে এ চাকরিতে প্রতিদিন সে ৩শ টাকা করে পায়। একটি টাকাও নিজে না রেখে মায়ের চিকিৎসার জন্য তার বাবাকে দিয়ে দেয়। আর বেশিকিছু না বলে অবশেষে দোকান থেকে নাস্তা কিনে খেতে কিছু টাকা দিয়ে ফিরে আসি।
অদ্ভুত মানুষের জীবন। আমরা কি পারি না সমাজে তাদের পাশে দাঁড়াতে! 'সবার জন্য শিক্ষা'র পর্যায়ে কি এহেসান পড়ে না, বড় হয়ে মানুষের সেবা করা কি তার অধিকার নেই!
এভাবে প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে দেশের কতইনা এহেসানদের উজ্জল বভিষ্যৎ।