আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
বাংলাদেশের সঙ্গে একাধিক আলোচনা বাতিল করেছেন মিয়ানমারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। অক্টোবর থেকে দেশটির সেনাবাহিনী দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্রোহ-বিরোধী অভিযান বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বৈঠক বাতিলের মাধ্যমে সীমান্ত সহিংসতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য মিত্ররাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত করেছে দেশটি। বার্তাসংস্থা রয়টার্স তাদের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এমন মন্তব্য করেছে।
এতে বলা হয়, রয়টার্সের হাতে আসা কিছু নথিপত্রে বৈঠক বাতিল হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এ সভাগুলো ছিল ‘বিদ্বেষপরায়ণ’ দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে নেয়া বহু প্রচেষ্টার মধ্যে সবচেয়ে সাম্প্রতিক। দুই দেশই রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়কে অপর দেশের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশি কূটনীতিকরা বলছেন, মধ্য-অক্টোবরে ওই আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা মিয়ানমার আকস্মিক বাতিল করে দেয়। এ বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সীমান্তে লিয়াজোঁ কর্মকর্তা নিয়োগ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে মিয়ানমারের অনিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ।
এক জ্যেষ্ঠ বাংলাদেশি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এ মুহূর্তে যে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি তা বিবেচনায় এ দুটি নথি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে।’ তবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি মিয়ানমার।
কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, দু’ দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস দূর করাটা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থার উন্নতি ও মিয়ানমারের বিদ্রোহ দমনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের একটি হিসাব অনুযায়ী, ১লা নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন অঙ্গরাজ্য থেকে প্রায় ২৭০০০ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সহিংসতার প্রথম দিকে আরো মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করে থাকতে পারে। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইনে বসবাস করেন। তারা মিয়ানমার ও বাংলাদেশের নাগরিক নন। উভয় দেশই বিভিন্ন আদমশুমারি ও ঐতিহাসিক নথিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করে যে, এ রোহিঙ্গাদের আবাস মূলত অপর দেশে।
বাতিল হওয়া বৈঠক আরো ইঙ্গিত দেয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সূচির ৮ মাস বয়সী প্রশাসন ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই সংকট তিনি যেভাবে মোকাবিলা করেছেন তাতে পশ্চিমা বিশ্ব ও মালয়েশিয়ার মতো এশিয়ান দেশগুলো সমালোচনা করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে, রাখাইনে সামরিক অভিযান চলাকালে সেনারা রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করেছে। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। হত্যা করেছে বেসামরিক মানুষকে। তবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সরকার উভয়েই এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল অং জ লিন ১৩ই অক্টোবর বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, ‘বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী ও মিয়ানমার প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যকার সেনাবাহিনী পর্যায়ের বৈঠকের ব্যাপারে, আমি গভীর অনুতাপের সঙ্গে আপনাদের জানাচ্ছি যে আমাদের কর্তৃপক্ষ এটি পেছাতে চায়।’ ১৬ই অক্টোবর থেকে বাংলাদেশে প্রায় সপ্তাহব্যাপী বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এটি বাতিলের পেছনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ‘অপ্রত্যাশিত কাজ’কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।
সীমান্ত চৌকিতে এক হামলায় মিয়ানমারের ৯ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার চারদিন পর এ চিঠিটি পাঠানো হয়। ওই হামলার পর থেকে রাখাইনে ব্যাপক সংখ্যক সেনা ঢুকে পড়ে। পাঁচদিন পর, মিয়ানমার পুলিশের আন্তঃদেশীয় অপরাধ বিরোধী বিভাগের প্রধানও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে পূর্বপরিকল্পিত একটি বৈঠক বাতিল করেন। ঢাকায় ২৫-২৭শে অক্টোবর ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কারণ হিসেবে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়।
একটি নথি নিয়ে বাংলাদেশি কূটনীতিকরা আলোচনা করতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। সেটি হলো, নিরাপত্তা সংলাপ ও সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক। রয়টার্সের পর্যালোচনাকৃত আরেকটি নথিতে দেখা যায়, উভয় দেশের সীমান্তে সীমান্ত লিয়াজোঁ কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার কথা। এছাড়া যৌথ টহলসহ সহযোগিতামূলক পদক্ষেপের কথাও সেখানে উল্লেখ ছিল।
সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশি কূটনীতিকরা গত মাসে বলেন যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনা থেকে মিয়ানমার নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ওই আলোচনাকে দুই দেশের রাষ্ট্র প্রধানের বৈঠকের পূর্বে প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ওই জ্যেষ্ঠ বাংলাদেশি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সব জায়গায় গিয়েছি, সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। কিন্তু আমাদেরকে বিলম্ব আর অনাগ্রহ দেখানো হয়েছে।’
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশই হলো মিয়ানমারের একমাত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্র যেখানে মিয়ানমারের সরকার প্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সূচি সফর করেননি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আয়ি আয়ি সো বলেন, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে আগেও বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বর্তমান শরণার্থী ইস্যু ছিল। কিন্তু সেখানে সীমান্ত সংক্রান্ত অন্যান্য ইস্যুও ছিল। যেমন, মাদক পাচার ও অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধ। ওই কর্মকর্তা আর বিস্তারিত কিছু জানাননি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল রশিদুল হাসান বলেছেন, তিনি এ বৈঠক সম্পর্কে অবগত নন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত মাসে দু’ দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যে, ৯ই অক্টোবরের হামলায় দায়ী কিছু বিদ্রোহী বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে রাখাইনে প্রবেশ করেছে। এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তিরস্কার করা হয়।
সূচির সরকার ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাখাইনের সহিংসতা। তার প্রধান অগ্রাধিকার অর্থাৎ জাতিগত যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্য এতে হুমকিতে পড়েছে। মিয়ানমারে দশকের পর দশক ধরে বিদ্রোহ চলে আসছে। সম্প্রতি চীন সীমান্তের কাছেও সংঘাত বৃদ্ধি পেয়েছে।
রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্টরা দাবি করেন, রাখাইনে তারা শ’ শ’ বছর ধরে বসবাস করছেন। তবে এ অঙ্গরাজ্যটিও মিয়ানমারের বাকি অংশের মতো বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ। মিয়ানমার রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। আবার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশও রোহিঙ্গাদের গ্রহণে রাজি নয়। ১৯৯২ সাল থেকে তাদেরকে শরণার্থীর মর্যাদা দেয়নি বাংলাদেশ সরকার।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত শিবিরের ৩২ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গাকে সহায়তা দিয়ে আসছে। সংস্থাটির অনুমান, প্রায় ৫ লাখ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাস করছে। ২০১২ সালের পর থেকে এ সংখ্যা বাড়ছে। ওই বছর রাখাইন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সংঘাত বাধে। ওই দাঙ্গায় নিহত হয় শতাধিক মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয় হাজার হাজার রোহিঙ্গা।
মিয়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘের সাবেক কূটনীতিক রিচার্ড হরসে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সবসময়ই ‘গভীর উত্তেজনা ও সন্দেহের’ দৃষ্টিতে দেখা হতো মিয়ানমারে। তিনি বলেন, ৯ই অক্টোবরের হামলার পর ঢাকার সহায়তা না চেয়ে মিয়ানমার একটি সুযোগ হেলায় হারাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম দিকে সহযোগিতা করেছে। আর উগ্রপন্থি সংগঠনের বিরুদ্ধে তদন্তে বাংলাদেশের রেকর্ড বিবেচনায়, এটি কিছুটা আশ্চর্য্যের যে মিয়ানমার ওই হামলা নিয়ে বাংলাদেশের প্রতি আরো মুক্তমনে এগিয়ে যায়নি।’
সূত্র : মানবজমিন na
- Blogger Comments
- Facebook Comments
Item Reviewed: বাংলাদেশ-মায়ানমার বৈঠক বাতিল
Rating: 5
Reviewed By: Unknown