
স্পোর্টস বার্তা:
টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়লেন এক ভক্ত। গ্যালারিতে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়ানো ভক্তটি প্রার্থনায় বসে পড়েছেন দুহাত এক করে। সৃষ্টিকর্তার কাছে মোনাজাতে যে তার চাওয়া বাংলাদেশের জয়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। হাত দুটো কাঁপার চিত্রটাও পড়ল ধরা। ওই দৃশ্যটা যেন তখন ১৬ কোটি বাঙালির প্রতীক! ক্রিকেট দেবতা শোনেননি সেই প্রার্থনা। মিরপুরের ২২ গজের মঞ্চের ভাগ্যটা যে লেখা ছিল অন্যভাবে। তাই তো ইমরুল কায়েসের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি কিংবা সাকিব আল হাসানের অমন ঝোড়ো ইনিংসটাও হতাশার আধারে লুকিয়ে পড়ল ইংল্যান্ডের জয়ে!
ইংলিশদের ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ৩০৯ রান একটা সময় মনে হচ্ছিল সময়ের অপেক্ষা। ‘প্রিয়’ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ইমরুলের সেঞ্চুরি ও সাকিবের কার্যকরী ইনিংসে জয়ের পাল্লা ভারি ছিল তো বাংলাদেশের দিকেই। কিন্তু একটা ওভারে এলোমেলো হয়ে গেল সব। সাকিবের আউটে হঠাৎই ছন্দপতন হওয়া বাংলাদেশ আর পারেনি ঘুরে দাঁড়াতে। শেষ পর্যন্ত ৪৭.৫ ওভারে ২৮৮ রানে অলআউট হয়ে হেরেছে ২১ রানে।
৩১০ রানের লক্ষ্যটা মোটেও সহজ ছিল না বাংলাদেশের জন্য। বিশেষকরে প্রতিপক্ষ যখন ইংল্যান্ডের মতো দল। যদিও ঘরের মাঠে গত কিছুদিনে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স আশাই জাগিয়েছে ভক্তদের। আশার সেই পথের শুরুটা স্বাগতিকদের হয়েছিল ভালোই। উদ্বোধনী জুটিতে ইমরুল-তামিম ইকবাল যোগ করেন ৪৬ রান। যদিও শুরু থেকেই নিজের সেরা ব্যাটিংটা করতে পারেননি তামিম। ইনিংসটাও তাই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলেন না বেশি দূর। ব্যক্তিগত ১৭ রান করেন তিনি আউট হন অভিষিক্ত বোলার জেক বলের শিকার হয়ে।
তামিম ফিরলেও একপ্রান্ত আগলে রেখে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে দলের রান বাড়িয়ে নিয়েছেন ইমরুল। প্রস্তুতি ম্যাচে সেঞ্চুরি করে একাদশে জায়গা করে নেওয়া এই ওপেনার জবাব দিয়েছেন নির্বাচকদের আস্থার। ওয়ানডেতে তার নামের পাশে একটি মাত্র সেঞ্চুরি ছিল এতদিন। সেই ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছিলেন ১০১ রানের ইনিংস। এর পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই ম্যাচ দিয়েই তো আবার তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারের দেখা পেলেন ইমরুল। দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি পূরণ করে খেলেছেন ১১৯ বলে ১১২ রানের ইনিংস। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে তিনি সাব্বির রহমানের সঙ্গে যোগ করেন ৩৬ রান। সাব্বির অবশ্য লম্বা করতে পারেননি ইনিংসটা। ডেভিড উইলির দুর্দান্ত ক্যাচে আউট হন তিনে। ১১ বলে তিনি করেছেন ১৮ রান। জেক বলের আগের বলেই মেরেছিলেন চার। আত্মবিশ্বাসী সাব্বির পরের বলটা উড়িয়ে মারলেন ডিপ মিডউইকেটে, বল ভাসতে ভাসতে যাচ্ছিল সীমার ওপারে। লাফ দিলেন উইলি। বল ধরলেন কিন্তু নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারলেন না ইংলিশ পেসার, যদিও নিজে সীমানা পেরিয়ে গেলেও তালুবন্দি করা বলটা শূন্যে ভাসিয়ে এপারে এসে আবার মুঠোবন্দি করলেন বল। তাতে দুর্দান্ত এক ক্যাচ ধরে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান ভয়ঙ্কর হয়ে উঠা্ সাব্বিরকে। তার পর মাহমুদউল্লাহও সঙ্গ দিয়েছেন ইমরুলকে। ভালোই খেলছিলেন তিনি। ইমরুলের সঙ্গে ৫০ রানের জুটি গড়ে এগিয়ে নিচ্ছিলেন বাংলাদেশের স্কোর। ক্রিজে সেট হয়ে গিয়ে যখন বড় ইনিংস খেলার আভাস দিচ্ছিলেন তিনি, তখনই করলেন ভুল। আদিল রশিদের ঝুলিয়ে দেওয়া বল উড়িয়ে মেরেছিলেন ডিপ মিডউইকেটে, সেখানেই ধরা পড়েন অতিরিক্ত খেলোয়াড় বিলিংসের হাতে। আউট হওয়ার আগে ২৬ বলে করেন ২৫ রান।
ইমরুলকে সবচেয়ে ভালো সঙ্গ দিয়েছেন সাকিব। বাংলাদেশি অলরাউন্ডারের ব্যাট জ্বলে উঠেছিল এই ম্যাচেও। এবার বরং আরও আক্রমণাত্মক ইনিংস খেলছেন তিনি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ইংলিশ পেসারদের ওপর ঝড় তুলে ৫৫ বলে করেছেন ৭৯ রান, যাতে ছিল ১০টি চার ও একটি ছয়ের মার। পঞ্চম উইকেটে তিনি ইমরুলের সঙ্গে যোগ করেন ১১৮ রান। তাতে জয়ের স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। স্বাগতিকদের স্কোর যে তখন ৪১.৩ বলে ৫ উইকেটে ২৭১। কিন্তু সাকিব আউট হওয়ার পরই এলোমেলো হয়ে যায় সব। তার আউটের পরের বলেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন মোসাদ্দেক হোসেন (০)। বাংলাদেশের ইনিংসের শেষের ঘন্টাও যেন বেজে উঠে তখনই। তবু আশার আলো হয়ে জ্বলে ছিলেন ইমরুল। কিন্তু পারেননি, দুর্দান্ত ইনিংস খেলে বাংলাদেশি ভক্তদের মন জিতে নিলেও দলকে জেতাতে পারেননি এই ওপেনার।
এর আগে দুইবার জীবন পাওয়ার সুযোগটা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন বেন স্টোকস। বাংলাদেশি ফিল্ডারদের সৌজন্যে তিনি পূরণ করেছেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিও। এতদিন পাকিস্তানের বিপক্ষে ৭৫ রান ছিল তার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। যদিও তাতে আছে বাংলাদেশি বোলারদের অবদান! স্টোকসকে যে দুই দুইবার জীবন দিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ ও মোশাররফ রুবেল। প্রথমে সহজ ক্যাচ তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন মাহমুদউল্লাহ। তাসকিন আহমেদের বলে মিডঅনে নিচু ক্যাচ ধরেও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। কয়েক বল পর আবারও বেঁচে যান স্টোকস মোশাররফ রুবেলের সৌজন্যে। সেঞ্চুরি পূরণ করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নেওয়া স্টোকসের উইকেটটি তখন নিতে পারলে নিশ্চিতভাবেই চেপে ধরা যেত ইংলিশদের। শেষ পর্যন্ত ১০০ বলে ১০১ রান করে আউট হন এই অলরাউন্ডার।
একটা সময় ৬৩ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে কঠিন চাপের মধ্যে ছিল ইংল্যান্ড। দ্রুত উইকেট হারানোয় পথ হারানো ইংলিশ তরীর হাল ধরেন স্টোকস। যোগ্য সঙ্গ পেয়েছেন তিনি অভিষিক্ত বেন ডাকেটের কাছ থেকে। চতুর্থ উইকেটে তারা যোগ করেন ১৫৩ রান। স্টোকেসের সেঞ্চুরি পূরণ করার আগে অভিষেকেই হাফসেঞ্চুরির দেখা পাওয়া ডাকেটকে ফেরান শফিউল ইসলাম। উইকেট ছেড়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, উদ্দেশ্যে ছিল বড় শট খেলার, কিন্তু শফিউলের ফুলটস বল সরাসরি আঘাত করে উইকেটে। বোল্ড হয়ে ফিরে যান ৬০ রান করা ডাকেট। তিনি আউট হওয়ায় ভাঙে স্টোকসের সঙ্গে গড়া ১৫৩ রানের জুটি। কিছুক্ষণ পর আউট হন স্টোকসও। দুর্দান্ত সব শট খেলে ১০০ বলে ৮ চার ও ৪ ছক্কায় খেলেছেন তিনি ১০১ রানের ইনিংস। মাশরাফির বলে সাব্বির রহমানের হাতে ধরা পড়েন এই অলরাউন্ডার। তিনি ফিরে যাওয়ার পর অধিনায়ক জশ বাটলার ঝড় তুললে ইংলিশদের স্কোর ছাড়ায় ৩০০। বাটলার ৩৮ বলে ৩ চার ও ৪ ছক্কায় খেলেছেন ৬৩ রানের কার্যকরী ইনিংস।
লক্ষ্যটা কঠিন ছিল বাংলাদেশের, তবে ভয় পায়নি এতটুকুও। বুক চিতিয়ে লড়াই করে তো জয়ের পথটাও করেছিল তৈরি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছন্দ ধরে রাখতে না পারায় পথ হারায় স্বাগতিকরা। তাই কোনও প্রার্থনাই কাজে আসেনি বাংলাদেশের জন্য!